lifocyte.com

ই-বুক : : মহাত্মা হ্যানিম্যান

সুত্রগুলো পড়ার জন্য সুত্রের রেঞ্জগুলোর ডান পার্শ্বে থাকা + চিহ্নটিতে ক্লিক করুন এভাবে সুত্রর পার্শ্বে থাকা + চিহ্নটিতে ক্লিক করুন। সুত্রটি পড়া হয়ে গেলে ডান পার্শ্বে থাকা - চিহ্নটিতে ক্লিক করুন। এভাবে ই-বুকটি ব্যবহার করুন। ধন্যবাদ।

চিকিৎসকের মহৎ ও একমাত্র উদ্দেশ্য হলো রোগীকে স্বাস্থ্যে ফিরিয়ে আনা, যাহাকে বলা হয় আরোগ্য বিধান করা।

আরোগ্যবিধানের উচ্চতম আদর্শ হলো দ্রুত, বিনাকষ্টে ও স্হায়িভাবে স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার, কিংবা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে, সর্বাপেক্ষা নির্ভরযোগ্য ও নির্দোষ উপায়ে, সহজবোধ্য নীতির সাহায্যে সমগ্রভাবে রোগের দূরীকরণ ও বিনাশ।

যদি চিকিৎসকের স্পষ্ট বোধ থাকে পীড়ায় অর্থাৎ প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে কি সারতে হবে ( ব্যাধি সম্বন্ধে জ্ঞান), যদি তিনি জানেন ভেষজগুলোতে অর্থাৎ প্রত্যেকটি ভেষজের ভিতরে কি আরোগ্যশক্তি নিহিত আছে ( ভেষজশক্তি সম্বন্ধে জ্ঞান), যদি তিনি জ্ঞাত থাকেন- রোগীর ভিতরে যা পীড়া বলে নিঃসন্দেহে জানা গেছে তার উপর কেমন করে স্পষ্ট ধারণাযুক্ত নীতি অনুসারে ভেষজের আরোগ্যশক্তিকে প্রয়োগ করতে হয়- যার ফলে আরোগ্যকার্য শুরু হবে এবং ভেষজটির ক্রিয়াপ্রণালী অনুসারে রোগীর উপর প্রয়োগের যোগ্যতা সম্বন্ধে তা সুনির্বাচিত কিনা ( ওষুধ নির্বাচন); এবং তা ছাড়া ইহা প্রস্তুত করার ঠিক পদ্ধতি কি পরিমাণে প্রয়োজন ( মাত্রা) এবং পুনঃপ্রয়োগ করার উপযুক্ত সময় এবং পরিশেষে প্রত্যেকটি আরোগ্যের ক্ষেত্রে কি বাধা ও তা কি উপায়ে দূরীভূত করা হয় তাতে আরোগ্যবিধান স্থায়ী হতে পারে- চিকিৎসকের এ সব যদি জানা থাকে তা হলে সুবিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধিসম্মতভাবে কি প্রকারে চিকিৎসা করা যায় তখন তাঁর বোধগম্য হবে এবং তিনি তখন আরোগ্য-নৈপুণ্যে প্রকৃত চিকিৎসক।

যে সকল কারণ স্বাস্থ্যের বিশৃঙ্খলা আনয়ন করে এবং পীড়ার উৎপত্তি ঘটায়, স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিগণের নিকট হইতে সেগুলিকে কেমন করিয়া দূরে রাখা যায়, এ সব তথ্য তাঁহার ( চিকিৎসকের) জানা থাকিলে তিনি স্বাস্থ্যসংরক্ষকও বটে।

রোগ আরোগ্য করিবার সহায়তার জন্য চিকিৎসকের জানা প্রয়োজন- অচির রোগোৎপত্তির পক্ষে অতি সম্ভাব্য উদ্দীপক কার এবং চিররোগের সমগ্র ইতিহাসে বিশেষ বিশেষ জ্ঞাতব্য বিষয়গুলি বাহির করিতে হইবে। ঐ সমস্ত প্রধান কারণগুলি চিররোগের উৎপাদিকা শক্তি। এইসব বিষয়ে অনুসন্ধান করিবার জন্য রোগীর শারিরীক গঠন, তাহার মানসিক ও চরিত্রগত বিশেষত্বসমূহ, রোগীর জীবিকা, তাহার বাসস্থান, বেশভূষ্য, সামাজিক ও গার্হস্থ্য তথ্য, দাম্পত্য ক্রিয়া প্রভৃতি সমস্ত বিষয় বিবেচনা করিতে হইবে।বে।

যেইসব মতবাদ অতীন্দ্রিয় সেইসব মতবাদ চাক্ষুষ প্রমাণ করা যায় না বলিয়া কুসংস্কারবিহীন দর্শক তাঁহার সূক্ষদর্শিতা যত প্রখর হোক না কেন, প্রত্যেক রোগে রোগীর মনে ও দেহের কি বাহ্যিক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে তাহা ছাড়া আর কিছুই লক্ষ্য করেন না,অর্থাৎ সুস্থাবস্থায় লোকটির কি প্রকার অবস্হা ছিল, এখন রোগ হওয়ার পর কি কি অস্বাভাবিক অবস্হা রোগী অনুভব করিতেছে এবং সেবা শূশ্রুষাকারীরা কি কি উপলব্ধি করিতেছেন ও চিকিৎসক কি কি উপলব্ধি করিতেছেন তাহাই তিনি লক্ষ্য করেন। তাই দেখা যাইতেছে যে এই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য লক্ষণগুলিই সম্পূর্ণ রোগ প্রকাশ করিয়া থাকে। এই লক্ষণগুলি দ্বারাই রোগের আকৃতি অংকন করা যায়।

কোন রোগের ক্ষেত্র হইতে উদ্দীপক বা পরিপোষক কারণ যখন দূরীভূত করিতে হইবে না তখন পীড়ার লক্ষণ ছাড়া আর কিছু আমরা ধারণা করিতে পারি না। রোগনিরাময় করিবার জন্য যে ঔষধ প্রয়োজন তাহাকে নির্দেশ করিবে একমাত্র সেইসব লক্ষণাবলী (কোন রোগবীজ বা মায়াজম আছে কিনা এবং তার আনুষঙ্গিক অবস্হা সম্বন্ধে অবহিত হইয়া- ৫ম সূত্র)। বিশেষ করিয়া এইসব লক্ষণের সমষ্টিই হইল আভ্যন্তরীণ মূল রোগের অর্থাৎ পীড়িত জীবনীশক্তির বাহিরের প্রতিচ্ছবি এবং এইগুলিই হইবে একমাত্র অবলম্বন যাহার দ্বারা সুনির্বাচিত ঔষধ নির্ণীত হইবে। মোটকথা লক্ষণসমষ্টিই হইবে প্রধান, বস্তুত ইহাই একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় যাহার সাহায্য চিকিৎসক তাঁহার চিকিৎসানৈপুণ্যে রোগীকে নিরাময় করিয়া স্বাস্হ্যে ফিরাইয়া আনিতে পারেন।

ইহা ধারণাতীত কিংবা পৃথিবীর কোন অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে ব্যাধির সমস্ত লক্ষণ এবং বোধগম্য সমগ্র বিষয় তিরোহিত হইলে স্বাস্থ্য ছাড়া আর কিছু থাকিতে পারে বা থাকা উচিত, অথবা পীড়ার আভ্যন্তরীণ বিকৃতি নির্মূল না হইয়া থাকিতে পারে।

মানুষের সুস্হাবস্হায় অতীন্দ্রিয় জীবনীশক্তি ( অট্যোক্র্যাসি)- যাহাকে ডাইনামিস বলা হয় এবং যাহা এই জড়দেহকে সঞ্জীবিত রাখে- অসীম ক্ষমতায় নিজের কর্তৃত্ব প্রকাশ করে এবং বোধশক্তি ও কার্যকারিতার দিক দিয়া দেহের সকল অবয়বকে অত্যুত্তমরূপে ও সুসামঞ্জস্যভাবে বজায় রাখে, যাহার ফলে আমাদের অন্তঃস্থিত বিবেকসম্পন্ন মন এই জীবন্ত সুস্হ দেহকে জীবনের উচ্চতর উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বাধীনভাবে নিয়োগ করিতে পারে।

জীবনীশক্তিকে বাদ দিয়া জড়দেহের অনুভব করিবার, কার্য সম্পাদন করিবার, আত্মরক্ষা করিবার কোন সামর্থ্য নাই। সমস্ত অনুভবশক্তি দেহ পায় এবং জীবনধারণ ব্যাপার সম্বন্ধীয় সমস্ত কার্য দেহ নিষ্পন্ন করে, কেবল এই অশরীরী সত্তার (প্রাণধারণনীতি) সাহায্যে, এবং ইহা স্বাস্হ্য ও ব্যাধিতে এই জড়দেহকে সঞ্জীবিত রাখে।

যখন কোন ব্যক্তি পীড়িত হয় তখন কেবলমাত্র অশরীরী স্বয়ংক্রিয় জীবনীশক্তিই কোন প্রাণবিরোধী পীড়াদায়ক উপাদানের সূক্ষ্ম প্রভাবদ্বারা বিশৃঙ্খলাপ্রাপ্ত হয়। এই প্রাণধারণনীতিই এইরূপ অস্বাভাবিকভাবে বিশৃঙ্খলিতা হইলে দেহের ভিতরে অপ্রীতিকর অনুভূতিসমূহ আসিয়া উপস্হিত হয় এবং দেহকে অস্বাভাবিক গতিপথে পরিচালিত করে ইহাকেই আমরা বলি ব্যাধি। যেহেতু এই শক্তিকে দেখা যায় না এবং কেবল দেহের উপর ক্রিয়া প্রকাশ দ্বারা ইহাকে চিনিতে পারা যায়, সেইজন্য ইহার পীড়াদায়ক বিশৃঙ্খলা ব্যাধিরূপে জানিতে পারা যায় কেবলমাত্র সেই সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অনুভূতি ও ক্রিয়ার ভিতর দিয়া যেগুলি পর্যবেক্ষক ও চিকিৎসকের ইন্দ্রিয়গোচরে আসে অর্থাৎ তাহা গোচারীভূত হয় রোগের লক্ষণ দ্বারা অন্য কোন প্রকারেই নহে ।

কেবলমাত্র অসুস্থ জীবনীশক্তি ব্যাধি উৎপন্ন করতে পারে যাহার ফলে আমার দৃষ্টির বিষয়ীভূত রোগচিত্রে তৎক্ষণাৎ প্রতিফলিত হয় অন্তর্নিহিত সমগ্র পরিবর্তন অর্থাৎ সেই প্রকাশ হইল আভ্যন্তরীণ জীবনীশক্তির সমগ্র ব্যাধিবিশৃঙ্খলা; এক কথায় তাহাই হইল সমগ্র ব্যাধির অভিব্যক্তি। আর, চিকিৎসার ফলে দৃষ্টিগম্য রোগচিত্রের এবং সূস্হ প্রাণক্রিয়া হইতে পৃথক সকল অসুস্হকর পরিবর্তনের অন্তর্ধান নিশ্চয়ই সূচিত করে জীবনীশক্তির অখন্ড সত্তার পুনরুদ্ধার, অতএব সমগ্র দেহের ফিরিয়া পাওয়া স্বাস্হ্য।

অতএব ব্যাধি সম্বন্ধে (যাহা সার্জারির অন্তর্ভুক্ত নহে) অ্যালোপ্যাথগণের এই যে ধারণা অর্থাৎ সমগ্র জীবনসত্তা এবং দেহ ও তার সঞ্জীবনী প্রাণশক্তি হইতে ব্যাধি পৃথক এবং তাহা যতই তীব্র প্রকৃতির হউক না কেন দেহাভ্যন্তরে লুক্কায়িত থাকা- তাহা সম্পূর্ণ অসঙ্গত এবং কেবল জড়ধর্মী মনই তাহা কল্পনা করিতে পারে। এই ধারণা হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া প্রচলিত চিকিৎসা- পদ্ধতিকে এই সকল ক্ষতিকর প্রেরণা যোগাইয়া আসিতেছে যাহার ফলে এই চিকিৎসা একটি যথার্থ অনিষ্টসাধক (অনারোগ্যকারী) বৃত্তিতে পরিণত হইয়াছে।

মানুষের দেহাভ্যন্তরে আরোগ্যযোগ্য এমন কোনো অসুস্থতা এবং অদৃশ্য বিশৃঙ্খলা থাকিতে পারে না যাহা যথার্থ পর্যবেক্ষণশীল চিকিৎসকের নিকটে পীড়াসূচক লক্ষণাদির দ্বারা ধরা না পড়ে। এইযে ব্যবস্থা তাহা সর্বজ্ঞানাধার লোকপালক পরমেশ্বরের অসীম করুণারই সম্পূর্ণ অভিপ্রেত ।

যে অতীন্দ্রিয় জীবনীশক্তি অদৃশ্য দেহাভ্যন্তরে অবস্থিত থাকিয়া আমাদের দেহকে সঞ্জীবিত রাখে তাহার বিশৃঙ্খলা অবস্থাহেতু পীড়া এবং তাহার দ্বারা সৃষ্ট বাহিরে বোধগম্য লক্ষণসমষ্টি যাহাকে বর্তমান অসুস্থতার প্রতিরূপ বলা যায় তাহাদের উভয়ের সত্তা অখন্ড এবং তাহারা সেই একই বস্তু। বস্তুত প্রাণ প্রিয়া প্রকাশের যন্ত্র হইল এই জড় দেহ, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত অনুভূতিশীল ও নিয়ামত জীবনীশক্তি ধারায় ইহাতে সজীবতার ব্যতিরেকে ইহার কোন সার্থকতা নাই, ঠিক যেমন দেহযন্ত্র ব্যতীত জীবনীশক্তিকে কল্পনা করা যায় না । অতএব একত্র মিলিয়া এক অখণ্ড সত্তা, যদিও সহজে বুঝিবার জন্য আমাদের মন কল্পনার সাহায্যে এই একাত্মতাকে দুইটি ধারণায় পৃথক করিয়া দেখে ।

আমাদের জীবনীশক্তি সুক্ষ্মধর্মী বলিয়া অতীন্দ্রিয় সূক্ষ্মশক্তির ক্রিয়া ব্যতিরেকে প্রাণক্রিয়ার শৃঙ্খলাভঙ্গকারি বাহিরের বিরুদ্ধশক্তি কর্তৃক আনীত সুস্থ দেহের উপর কোন অনিষ্টকর প্রভাবের দ্বারা তাহা আক্রান্ত বা প্রভাবান্বিত হইতে পারেনা । ঠিক তেমনি ভাবে আমাদের অতিন্দ্রীয় জীবনে শক্তির উপর ক্রিয়াশীল ভেষজের পরিবর্তনকারী অতিন্দ্রীয় শক্তির ( সূক্ষ্ম ফলোৎপাদক শক্তিসম্পন্ন) প্রভাব ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে ইহার সকল বিকৃতি ( ব্যাধি) দূর করা চিকিৎসকের পক্ষে সম্ভব নয়। দেহের সর্বত্র অবস্থিত অনুভূতিমূলক স্নায়ুমণ্ডলীর সাহায্যে জীবনীশক্তি ভেষজের প্রভাবে সারা দেয়। সুতরাং মনোযোগের সহিত পর্যবেক্ষণশীল ও অনুসন্ধিৎসু চিকিৎসকের নিকটে আরোগ্যবিধানের পক্ষে যতখানি প্রয়োজন ততখানি বিশদভাবে রোগীর স্বাস্থ্যের বোধগম্য পরিবর্তনসমূহ (লক্ষণসমষ্টি) ব্যাধিরূপে ধরা দিলে তাঁহার ব্যবস্হিত ঔষধসমূহের সূক্ষ্ম প্রভাব জীবনীশক্তির উপর প্রতিফলিত হইয়া স্বাস্থ্য ও সাবলীল প্রাণক্রিয়াকে পুনরায় আনয়ন করিতে সমর্থ হয় এবং তাহা কার্যত সম্পন্ন করিয়া থাকে।.

যেহেতু বোধগোম্য সমগ্র লক্ষণ সমষ্টি দূরীভূত হওয়ার ফলে আরোগ্যলাভের জীবনীশক্তির আভ্যন্তরীণ বিকৃতি – যাহার কারণে এই ব্যাধি- তাহাও যখন একই সময়ে দূরীভূত হয় তখন এই সিদ্ধান্তে আশা যাইতে পারে যে চিকিৎসকের কর্তব্য হইল শুধু সমস্ত লক্ষণ ঠিকভাবে দূরীভূত করা এবং একই সময়ে অন্তর্নিহিত বিশৃঙ্খলাকে অর্থাৎ যাহাকে বলা হয় জীবনীশক্তির অসুস্থতা, অর্থাৎ ব্যাধিই স্বয়ং তাহাকে রদ ও নির্মূল করা । ব্যাধি নির্মূল হয়, স্বাস্থ্য তখন ফিরিয়া আসে- ইহাই হইল চিকিৎসকের উচ্চতম একমাত্র লক্ষ্য অর্থাৎ বিদ্যার বৃথা আস্ফালন কাকুরিয়া রোগীকে সাহায্যদান দ্বারা নিজের যথার্থ উদ্দেশ্য বিষয়ে অবহিত থাকা ।

রোগের আনুষঙ্গিক হ্রাসবৃদ্ধির লক্ষণসহ রোগের সমগ্র লক্ষণসমষ্টি ছাড়া রোগে এমন আর কিছুরই পরিচয় পাওয়া যায় না যাহার দ্বারা চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভূত হয়। এই অবধারিত সত্য হইতে এই অবিসংবাদিত সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ঔষধ নির্বাচনে আমাদের একমাত্র পথপ্রদর্শক হিসাবে প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে অবস্থা ও সমগ্র লক্ষণসমষ্টিই হইবে একমাত্র নির্দেশক ।

যেহেতু ব্যাধি বলিতে সুস্থ ব্যক্তির স্বাস্থ্যের অস্বাভাবিক বিকৃতির লক্ষণ ছাড়া আর কিছু নয় এবং যেহেতু রোগীর স্বাস্থ্য সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়া আসার মধ্যেই নিহিত থাকে আরোগ্যলাভের একমাত্র সম্ভাবনা, তখন স্পষ্টই বুঝা যায় যে অনুভব ও ক্রিয়ার দিক দিয়া স্বাস্থ্যের কোন পরিবর্তন যদি ঔষুধে না ঘটাইতে পারিত তাহা হইলে ঔষধ কখনই আরোগ্যের সন্ধান করিতে পারিত না । বস্তুত ঔষধের আরোগ্যপ্রধান ক্ষমতার মূলে হইল একমাত্র তাঁহার সেই অন্তর্নিহিত শক্তি , যাহার দ্বারা তাহা মানুষের স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ঘটাইতে পারে ।

ভেষজের অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে নিহিত যে সূক্ষ্মশক্তিদ্বারা মানুষের স্বাস্থ্যে বিকৃতি ঘটে তাহা কখনও আমরা যুক্তির বলে ধারণা করিতে পারি না।সুস্থ দেহের উপর তাহার পরিদৃশ্যমান ক্রিয়াশীলতা হইতেই তাহার স্পষ্ট পরিচয় আমরা অভিজ্ঞতাসূত্রে লাভ করিয়া থাকি।

ইহা যেমন অনস্বীকার্য যে ভেষজের ভিতরে যে আরোগ্যদায়িনী শক্তি আছে তাহা অনুমানের বিষয় নহে এবং প্রকৃত পর্যবেক্ষকগণ ভেষজের বিশুদ্ধ পরীক্ষানিরীক্ষার ভিতর দিয়া মানুষের স্বাস্থ্যের, বিশেষত সুস্থ ব্যক্তির স্বাস্থ্যের বিকৃতিসাধন এবং নানাবিধ স্পষ্ট পীড়ালক্ষণ উৎপাদন ছাড়া তাহার ভেষজত বা আরোগ্যকারী ক্ষমতা বলিতে আর কিছু নির্ণয় করিতে পারেন না, তখন এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ভেষজ যখন রোগনিরাময়কারীরূপে কার্য করে তখন যে ক্ষমতাদ্বারা অসাধারণ লক্ষণসমূহ উৎপাদন করিয়া মানুষের স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে সেই ক্ষমতার ভিতর দিয়াই তাহার আরোগ্যকারী গুন প্রকাশিত হয় এবং সেই জন্য সুস্থদেহে ভেষজ যে বিকৃতি সাধন করে তাহার উপরেই তাহার অন্তর্নিহিত রোগ আরোগ্যকারী ক্ষমতার সম্ভব্য প্রকাশ নির্ভরশীল বলিয়া আমাদিগকে বিশ্বাস করিয়া লইতে হইবে । তাহা হইলেই প্রত্যেকটি ভেষজের ভিতরে রোগ উৎপাদনকারী শক্তি এবং সেই সঙ্গে রোগ আরোগ্যকারী শক্তি বলিতে কি বুঝায় তাহা জানা সম্ভব হইবে ।

স্বাস্থ্যে ফিরাইয়া আনার জন্য রোগের লক্ষণসমষ্টি পর্যবেক্ষণ করিয়া তাহা বিদূরিত করা ছাড়া আর যখন কিছুই করিবার নাই এবং ঠিক সেইভাবে সুস্থদেহে পীড়া উৎপাদন এবং রুগ্ন ব্যক্তিকে ব্যাধিমুক্ত করা ছাড়া ভেষজের আরোগ্যকারী ক্ষমতা বলিতে আর কিছু জানা যায় না, তখন এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ভেষজসমূহই কেবল রোগ আরোগ্য করিতে এবং ব্যাধিসমূহকে ধবংস করিতে সমর্থ, কেননা ভেষজপদার্থ কতকগুলো ক্রিয়া ও লক্ষণ উৎপাদন দ্বারা অর্থাৎ একটা কৃত্রিম ব্যাধির অবস্থা সৃষ্টি করিয়া পূর্ব হইতে অবস্থিত প্রকৃত ব্যাধিরলক্ষণসমূহকে অর্থাৎ যাহা আমরা আরোগ্য করিতে চাই সেগুলিকে বিদূরিত ও বিলুপ্ত করে।অপরপক্ষে ইহা বুঝিতে পারা যায় যে লক্ষণসমষ্টি বিশিষ্ট পীড়া আরোগ্য করিবার জন্য সেই ঔষধকেই (দ্রুত,নিশ্চিত অস্থায়ীভাবে রোগ আরোগ্যের জন্য সাদৃশ বা বিপরীত কোন প্রকার লক্ষণের সহায়তা প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতা অনুসারে)নির্বাচন করিতে হইবে যাহার সদৃশ্য অথবা বিপরীত লক্ষণ সৃষ্টি করিবার প্রবণতা আছে।

সকল প্রকার বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা ও নির্ভুল অনুসন্ধান হইতে আমাদের এই প্রতীতী জন্মে যে ব্যাধির বদ্ধমূল লক্ষণসমূহ ঔষধের বিপরীত লক্ষণ দ্বারা দূরীভূত বা বিনষ্ট হওয়া সম্ভবপর নহে (যেমন অ্যান্টিপ্যাথিক, এনঅ্যান্টিওপ্যাথিক বা প্যালিয়েটিভ উপায়ে )। পক্ষান্তরে সামরিক উপায়ে প্রতীয়মান হইলেও পুনরায় সেগুলি দারুণভাবে বৃদ্ধি পাইয়া গুরুতর আকার প্রকাশিত হয় ( ৫৮-৬২ ও ৬৯ সূত্র দ্রষ্টব্য )।

অতএব ব্যাধিতে সদৃশ পদ্ধতি ছাড়া ঔষধ প্রয়োগের আর এমন কোনো উপায় নাই যাহা প্রকৃত কার্যকারী বলিয়া বিবেচিত হতে পারে। ইহার (সদৃশ-পদ্ধতির)দ্বারা রোগীর ক্ষেত্রে লক্ষণসমষ্টির জন্য আমরা সমস্ত ঔষধের মধ্যে (সুস্থ শরীরে পরীক্ষার ফলে যাহাদের নিদান লক্ষণ জানা আছে) এমন একটি ঔষধ অনুসন্ধান করি যাহার বহুলাংশে ঐরূপ রোগীর প্রায় অনুরূপ রোগাবস্থা সৃষ্টি করিবার ক্ষমতা ও প্রবণতা আছে।

সুতরাং সকল সতর্ক পরীক্ষার ভিতর দিয়া বিশুদ্ধ অভিজ্ঞতা যাহাকে আরোগ্য-কলার একমাত্র অভ্রান্ত দৈবনির্দেশ বলা যায়- আমাদিগকে এই শিক্ষা দেয় যে প্রকৃতপক্ষে সেই ঔষধ যাহার সুস্থ শরীরের উপর ক্রিয়া-লক্ষণের,চিকিৎসিত রোগীর প্রকাশিত লক্ষণের সহিত সর্বাধিক সাদৃশ্য প্রকাশ করিবার ক্ষমতা আছে, তাহা উপযুক্ত শক্তি ও মাত্রায় দ্রুত ও স্থায়ীভাবে পীড়ার লক্ষণসমূহ কে অর্থাৎ (৬-১৬) সমগ্র পীড়াকে নির্মূল করিয়া স্বাস্থ্য পুনরানয়ন করিতে পারে। সকল ঔষধ, বিনা ব্যতিরেকে,সেই সকল পীড়ার ক্ষেত্রে আরোগ্যদান করিতে পারে যাহাদের লক্ষণাবলী ভেষজের নিজস্ব লক্ষণাবলীর প্রায় সদৃশ; তাহাদের কোনটিকেই অ-রোগমুক্ত রাখে না।

ইহা (অর্থাৎ সদৃশ লক্ষণ বিশিষ্ট ওষুধে রোগ নিরাময় হওয়া) নিম্নলিখিত হোমিওপ্যাথিক বিধি বা নিয়মের ওপর নির্ভর করে। ইহা কখনও কখনও অস্পষ্ট অনুমানের বিষয় হইলেও এ পর্যন্ত পুরাপুরিভাবে স্বীকৃতি লাভ করে নাই। প্রতিটি প্রকৃত আরোগ্য যাহা এযাবৎ ঘটিয়াছে তাহা এই নিয়ম অনুসারে। জীবন্ত দেহে সংক্রমিত একটি দুর্বল ব্যাধি অধিকতর বলশালী অপর একটি ব্যাধির সংক্রমণ দ্বারা স্থায়ীভাবে বিনষ্ট হয় যদি শেষোক্তটি (জাতিতে বিভিন্ন হইলেও) তাহার প্রকাশ লক্ষণে প্রথমোক্তটির খুব সদৃশ হয়।

অতএব ঔষধসমূহের আরোগ্যকারী ক্ষমতা নির্ভর করে তাহাদের সেই সকল লক্ষণসমূহের উপর যাহা রোগলক্ষণের সদৃশ অথচ তাহার অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী (১২-২৬)। তাহার ফলে প্রত্যেকটি রোগের পীড়া সুনিশ্চিত ও নির্ভুলভাবে দ্রুত ও স্থায়ী রূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত ও দূরীভূত হয় এমন একটি ঔষধ দ্বারা যাহা (মনুষ্যদেহে ) সর্বাধিক সদৃশ ও পূর্ণাঙ্গ অথচ অপেক্ষা অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন লক্ষণসমষ্টি সৃষ্টি করতে সমর্থ।

যেহেতু প্রাকৃতিক এই আরোগ্যবিধান জগতের প্রত্যেকটি বিশুদ্ধ পরীক্ষানিরীক্ষা এবং প্রত্যেকটি যথার্থ পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়ে ব্যক্ত, অতএব এই সত্য সুপ্রতিষ্ঠিত। কেমন করিয়া তাহা ঘটে এবং তাহার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি হইতে পারে তাহাতে কিছু আসে যায় না এবং আমি সেই ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টার দিকে বেশি জোর দেই না। কিন্তু নিম্নলিখিত যুক্তি যেহেতু অভিজ্ঞতার ভিত্তির উপর স্থাপিত সেইজন্য গ্রহণযোগ্যরূপে ধরা যাইতে পারে।

প্রত্যেকটি ব্যাধি ( যাহা সম্পূর্ণ সার্জারির অন্তর্ভুক্ত নহে ) যেমন প্রাণশক্তির (জীবনের মৌলিক উপাদানের সূক্ষ্মভাবে এক বিশেষ অসুস্থ পরিবর্তন মাত্র- যাহা অনুভূতি ও ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় – তেমনি প্রত্যেকটি হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য , প্রাকৃতিক ব্যাধি দ্বারা সূক্ষ্মভাবে পীড়িত এই মৌলিক উপাদান , লক্ষণসমষ্টির ঠিক সাদৃশ্য অনুসারে নির্বাচিত শক্তিকৃত ঔষধের প্রভাবে অধিকতর শক্তিশালী তৎসদৃশএকটি কৃত্রিম ব্যাধির দ্বারা আক্রান্ত হয়। ইহার ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল সূক্ষ্ম প্রাকৃতিক ব্যাধির প্রকাশিত তিরোহিত হয়। রোগের এই প্রকাশ প্রাণক্রিয়াকে আর অধিকার করিয়া থাকে না । তাহার স্থানে তখন অবস্থান করে ও প্রভূত করে কেবলমাত্র প্রবলতর কৃত্রিম ব্যাধিসৃষ্ট লক্ষণসমূহ। সেই কৃত্তিম ব্যাধির লক্ষণসমূহের শক্তি শীঘ্রই নিঃশেষ হইয়া যায় এবং রোগী রোগমুক্ত হইয়া আরোগ্যলাভ করে ।জীবনীশক্তি এইভাবে রোগমুক্ত হইয়া তখন সুস্থভাবে প্রাণক্রিয়া সম্পাদন করে চলে। এই যে অতি সম্ভবপর প্রক্রিয়া তাহা নির্ভর করে নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের উপর।

উপযুক্ত ঔষধ দ্বারা প্রাকৃতিক ব্যাধিসমূহ নিরাময় ও পরাভূত হইয়া থাকে, সেজন্য সুস্থ অবস্থায় মানবদেহকে প্রাকৃতিক ব্যাধি অপেক্ষা ভেষজ দ্বারা অধিকতর প্রবলভাবে আক্রান্ত হইতে দেখা যায় (তাহার কতকটা কারণ ঔষধের মাত্রানিয়ন্ত্রণ আমাদের আয়ত্তে থাকে বলিয়া) ।

যে বিরুদ্ধ শক্তিসমূহ- যাহা কতকটা আধ্যাত্মিক ও কতকটা ভৌতিক এবং যাহাদের সম্মুখে উন্মুক্ত রহিয়াছে আমাদের পার্থিব অস্তিত্ব এবং যাহাদিগকে বলা হয় পীড়াসৃষ্টিকারি শক্তিসমূহকে-মানুষের সুস্থ দেহকে সর্তবিহীন ভাবে পীড়িত করিবার ক্ষমতা তাদের নাই। কিন্তু আমরা তাহাদের দ্বারা তখনই পীড়িত হই যখন আগন্তুক ব্যাধি কর্তৃক আক্রান্ত হইবার, স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হইবার এবং অস্বাভাবিক অনুভূতি ও ক্রিয়াসমূহের অধীন হইবার ভাব ও প্রবণতা দেহে বিদ্যমান থাকে। অতএব তাহারা (বিরুদ্ধ শক্তিসমূহ) প্রত্যেক ক্ষেত্রে কিংবা সকল সময় ব্যাধি উৎপাদন করিতে পারে না ।

কৃত্রিম পীড়া উৎপাদনকারী শক্তিসমূহ যাহাদিগকে আমরা ভেষজ বলি তাহাদের কথা কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।প্রত্যেকটি প্রকৃত ভেষজ সকল সময়েই , সকল অবস্থায়, প্রত্যেকটি জীবন্ত মানুষ্যদেহে ক্রিয়া প্রকাশ করে এবং তাহার ভিতর অদ্ভুত লক্ষণসমূহ সৃষ্টি করে (সর্তবিহীন ভাবে) আক্রান্ত এবং প্রভাবান্বিত হইতে বাধ্য হয়, যাহা-যেমন পূর্বে বলা হইয়াছে-প্রাকৃতিক বিধিসমূহ সম্পর্কে খাটে না ।

এই তথ্য অনুসারে ইহা সকল অভিজ্ঞতা দ্বারা অবিসংবাদিত ভাবে স্বীকৃত যে পীড়া উৎপাদিকা শক্তি ও সংক্রামক রোগবিষ অপেক্ষা ভেষজশক্তির দ্বারা জীবন্ত মানুষ্যদেহ আক্রান্ত হওয়া এবং তাহার অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা ও সম্ভাবনা অধিকতর । অর্থাৎ পীড়া উৎপাদিকা শক্তির মানুষের সুস্থ শরীরকে পীড়িত করিবার যে ক্ষমতা তাহা সর্তাধীন, প্রায়ই অত্যন্ত সর্তসাপেক্ষ; কিন্তু ভেষজশক্তির যে ক্ষমতা তাহা সম্পূর্ণ সর্তবিহীন এবং পূর্বোক্তটি অপেক্ষা প্রবলতর ।

ঔষধ দ্বারা উৎপন্ন কৃত্রিম ব্যাধির প্রবলতর শক্তিই যে প্রাকৃতিক ব্যাধিসমূহকে সারাইবার একমাত্র কারণ তাহা নহে। রোগ আরোগ্য করিবার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানষ্যদেহে ভেষজজাত এমন একটি কৃত্রিম ব্যাধির সৃষ্টি করা যাহা যে রোগকে সরাইতে হইবে তাহা যথাসম্ভব তাহার সদৃশ হইবে এবং অধিকতর ক্ষমতাপ্রভাবে স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিবিহীন স্বয়ংক্রিয় জীবনীশক্তিকে অনুরূপভাবে পীড়িত করিবে। ইহা প্রাকৃতিক পীড়াকে যে শুধু অভিভূত করিবে তাহা নহে, তাহাকে নির্বাপিত করিয়া ধ্বংস করে দিবে। ইহা যেরূপ সত্য যে প্রকৃতিদেবীও নূতন শক্তিশালী বিসদৃশ রোগ প্রবর্তিত করিয়া দেহাধিকৃত কোন পূর্বের রোগকে দূরীভূত করিতে পারেন না সেইরুপ যে ভেষজ সুস্থদেহে অনুরূপ সদৃশ অবস্থা সৃষ্টি করিতে পারে না চিকিৎসায় তাহার আরোগ্যবিধান করার ক্ষমতা ঠিক ততটুকু ।

প্রাকৃতিক জগতে বিসদৃশ লক্ষণ বিশিষ্ট দুইটি প্রাকৃতিক ব্যাধি একদেহে একত্র মিলিত হইলে কি ঘটে এবং সাধারণ চিকিৎসাক্ষেত্রে অনুপযুক্ত এলোপ্যাথিক ঔষধসমুহ- যাহা রোগের সদৃশ কৃত্রিম পীড়ার অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে না -তাহ প্রয়োগ করলেই বা কি ফল হয় এই সম্বন্ধে বুঝিবার জন্য তিনটি বিভিন্ন অবস্থার কথা আলোচনা করিব।

মানবদেহের যদি বিসদৃশ লক্ষণসম্পন্ন দুইটি পীড়া মিলিত হয় এবং তাহারা যদি সমশক্তিসম্পন্ন হয় বা পুরাতন পীড়াটি নতুন পীড়া হইতে অধিক শক্তিশালী হয় তাহা হইলে পরে যেই নতুন পীড়াটি মানবদেহে প্রবেশ লাভ করিয়াছে তাহা পূর্বের শক্তিশালী রোগটি দ্বারা বিতাড়িত হয় এবং কিছুতেই শরীরে ক্রিয়া প্রকাশ করিতে সক্ষম হয় না। কোনো রোগী যদি একটি চিররোগে ভুগিতে থাকে, তবে তাহাকে হেমন্তকালীন আমাশয় পীড়া দ্বারা বা অন্য কোনো মহামারী পীড়ায় আক্রান্ত হতে দেখা যায় না ।শ্যামলীর মতে যেখানে স্কা্ভি রোগ খুব বেশী, সেখানে প্লেগ হইতে দেখা যায় না। এমনকি যারা কাউর রোগে ভোগে তাহাদেরও প্লেগ হয় না। জেনার বলেন, যে ছেলে শীর্ণতায় ভুগিতে থাকে, তাহাকে বসন্তের টিকা দিলে ঐ টিকা উঠে না। ভন্ হিলডেন ব্যান্ড এর মতে, যে রোগী যক্ষ্মারোগে ভুগিতেছে তাহাকে প্রবল সংক্রামক জ্বরে সহজে আক্রমণ করতে পারে না।

তদ্রুপ কোন পুরাতন চিররোগ সাধারণ চিকিৎসার দ্বারা (প্রচলিত এলোপ্যাথি মতে চিকিৎসায় ) অর্থাৎ সেই সকল ঔষধ দ্বারা চিকিৎসায় সুস্থ দেহে যাহাদের ব্যাধির সদৃশ অবস্থা উৎপন্ন করিবার ক্ষমতা নাই, এমনকি সেই চিকিৎসা বহু বৎসর ধরিয়া করা হইলেও — অবশ্য তাহা যদি খুব প্রচন্ড ধরনের না হয়, তাহা ( চিররোগ ) নিরাময় না হইয়া অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকিয়া যায়। দৈনন্দিন চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়, সুতরাং উদাহরন দিয়া বলিবার কোন প্রয়োজন নাই।

নবাগত বিসদৃশ রোগটি যদি বলবত্তর হয় তাহা হইলে নবাগত বলবত্তর পীড়ার সংক্রমণে যতদিন তাহার ভোগকাল শেষ না হয় ততদিন পূর্ব হইতে অবস্থিত দুর্বল পীড়াটি থাকে না এবং পরে সেই পুরাতন পীড়াটি না-সারা অবস্থায় আবার আবির্ভূত হইবে। টূলপিয়াস লক্ষ করিয়াছেন যে একপ্রকার মৃগী রোগে আক্রান্ত দুইটি শিশুর দদ্রুরোগ সংক্রামিত হওয়ার পর রোগটির আক্রমণ বন্ধ ছিল, কিন্তু মাথার চর্মরোগ অন্তর্হিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পূর্বের ন্যায় আবার মৃগী রোগ দেখা দিল। স্কোফ দেখিয়েছেন যে স্কার্ভির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে খোসচুলকানি অন্তর্হিত হইয়াছে, কিন্তু পূর্বোক্তটি সারিয়া যাওয়ার পরে পরেরটি আবার দেখা দিয়াছে। এইরূপে প্রবল টাইফাসরোগ আক্রমণের সময় ফুসফুসের যক্ষ্মা থাকে না, পূর্বোক্তটির ভোগ শেষ হওয়ার পরে আবার ফিরেয়া আসে। যক্ষ্মাগ্রস্থ রোগী উন্মাদরোগাক্রান্ত হইলে যক্ষ্মার সমস্ত লক্ষণ তিরোহিত হয়, কিন্তু উন্মত্ততা সারিয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে আবার যক্ষ্মা ফিরিয়া আসে এবং তখন তাহা আরও মারাত্মক হয়।যখন হাম ও বসন্ত উভয়ে একই সময়ে আসিয়া একটি শিশুকে আক্রমণ করে তখন হাম পূর্বে আসিলেও সাধারণত বসন্ত পরে আসা সত্ত্বেও তাহাকে চাপিয়া রাখে এবং বসন্ত সারিয়া না যাওয়া পর্যন্ত হামের ভোগ শুরু হয় না। আবার ম্যাঙ্গেট ইহাও দেখিয়েছেন যে হামের সংক্রমণের ফলে বসন্তের টিকা চারদিন স্থগিত থাকে, এবং হাম সারিয়া যাওয়ার পরে আবার টিকার ভোগ চলিতে থাকে। এমন কি যেখানে টিকা উঠিবার ছয় দিন পরে হাম হইয়াছে, এবং সেই সময়ে প্রদাহান্বিত টিকা একইভাবে থাকে এবং হামের সপ্তাহব্যাপী ভোগকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিকার কাজ আরম্ভ হয় না। হামজ্বর যখন ব্যাপকভাবে দেখা দেয় তখন বসন্তের টিকা লওয়ার চতুর্থ কিংবা পঞ্চম দিনেও অনেক লোক ঐ রোগে আক্রান্ত হইয়াছে এবং হামের ভোগকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিকা উঠা বন্ধ থাকে এবং তাহার পর আবার যথারীতি টিকা উঠিয়া তাহার ভোগ সমাপ্ত হয়। গলাক্ষতযুক্ত প্রকৃত, মসৃণ বিসর্পজাতীয় সিডেনহামস্কার্লেটিনা গোবীজটিকা লোয়ার চতুর্থ দিনে বন্ধ হইয়া যায় এবং টিকার ভোগকাল শেষ হওয়ার পরে আবার স্কার্লেটিনার পুনরার্বিভাব ঘটে। আবার অন্য এক সময়ে উভয় পিড়াই বোধহয় সামান শক্তিশালী বলিয়া গোবীজটিকা অষ্টম দিনে প্রকৃত, মসৃণ সিডেনহামস্কর্লেটিনা কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং যতদিন স্কার্লেটিনা সারিয়া না যায় ততদিন টিকার লাল ক্ষত দেখিতে পাওয়া যায় না, তাহার পর সঙ্গে সঙ্গেই আবার টিকা ওঠা শুরু হইয়া তাহার ভোগ শেষ হয়। কর্টুম লক্ষ্য করিয়াছেন, হাম গোবীজটিকাকে থামাইয়া রাখে, অষ্টম দিনে যখন গোবীজটিকার প্রায় পূর্ণাবস্হা তখন দেখা দেয়। টিকা তখন ঠিকভাবেই চলিতে থাকে এবং হাম শুকাইয়া না যাওয়া পর্যন্ত টিকার কাজ পুনরায় শুরু হয় নাই, সুতরাং দশম দিনে তাহা যে অবস্থায় দেখিতে পাওয়া উচিত ছিল তাহা ষোড়শ দিনের দিন দেখতে পাওয়া যায়। কুর্টুম ইহাও দেখিয়েছেন যে হাম ওঠার পরেও বসন্তের টিকা উঠিয়াছে, কিন্তু হাম সারিয়া না যাওয়া অবধি ইহার ভোগ শেষ হয় না।আমি নিজেও দেখেছি যে বসন্তের টিকা পূর্ণভাবে ওঠা মাত্র মাম্পস অন্তর্হিত হইয়াছে এবং গোবীজটিকা সম্পূর্ণ না উঠা পর্যন্ত ও তজ্জনিত লাল ক্ষত অন্তর্হিত না হওয়া পর্যন্ত একপ্রকার বিশেষ রোগবীজসৃষ্ট জ্বর ও তৎসহ গালগলা ফোলা পুনরাবির্ভূত হইয়া যথারীতি তাহার সপ্তাহব্যাপী ভোগকাল শেষ করে না। সকল বিসদৃশ ব্যাধি সম্বন্ধেই এই কথা খাটে, বলবত্তর পীড়া দূরের অপেক্ষাকৃত দুর্বল পীড়াকে দমন করিয়া রাখে (তাহারা পরস্পর উভয়কে জটিল করিয়া না ফেলিলে,যাহা তরুণ পীড়াসমূহ সম্বন্ধে কদাচিৎ ঘটে), কিন্তু কখনও পরস্পরকে আরোগ্যদান করিতে পারে না।

সাধারণপন্থী চিকিৎসকগণ (অ্যালোপ্যাথিক) এরূপ ঘটনা বহু শতাব্দী ধরিয়া দেখিয়াছেন। তাহারা দেখিয়াছেন যে প্রকৃতিদেবী নিজেও একটি ব্যাধি সৃষ্টি করিয়া- তাহা যতই শক্তিশালী হউক না কেন- দেহস্থিত অন্য একটি বিসদৃশ ব্যাধিক সারাইতে পারেন না। এই সব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চিররোগকে অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ দ্বারা অর্থাৎ সে সকল ঔষধের ব্যবস্থা দ্বারা-যাহাদের কী প্রকার পীড়া উৎপাদন করিবার ক্ষমতা তাহা ভগবানই জানেন-তাহারা যখন প্রায় সুনিশ্চিতভাবে রোগের বিসদৃশ অবস্থা উৎপাদন করিয়া চিকিৎসা করেন তখন তাহাদের সম্বন্ধে কি মনে করিব ?আর যদি চিকিৎসকগণ এতোকাল মনোযোগের সহিত প্রাকৃতিক বিধানের দিকে লক্ষ না করিয়া থাকেন তাহা হইলেও তাহাদের চিকিৎসার শোচনীয় ফল হইতে এই শিক্ষালাভ করা উচিত ছিল যে তাহারা একটি অনুপযুক্ত মিথ্যা পথ অনুসরণ করিয়া চলিয়াছেন। তাহাদের রীতি অনুসারে তাহারা যখন চিররোগে প্রচন্ড অ্যালোপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ করিয়া থাকেন তখন তাহারা কি টের পান না যে তদ্দ্বারা মূল রোগের বিসদৃশ আর একটি কৃত্তিম পীড়া তাহারা সৃষ্টি করিয়াছেন। আর সেই রোগকে যতক্ষণ বজায় রাখা হয় তাহা মূল রোগটিকে সরাইয়া রাখে, স্থগিত রাখে,চাপা দিয়া রাখে এবং যখনই রোগীর দুর্বল শক্তি অ্যালোপ্যাথিকআক্রমণ আর গ্রহণ করিতে পারে না তখনই সেই মূল রোগটির আবার সুনিশ্চিত আবির্ভাব ঘটে। এইরূপেই কডা জোলাপ পুনঃপুন প্রয়োগ করার ফলে নিশ্চিতরূপে অতি সত্বর তাহা অন্তর্হিত হয়,কিন্তু যখন রোগী অন্তের উপর সেই কৃত্তিম পীড়ার বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া আর জোলাপ লইতে চাই না তখন হয় চর্মরোগ পূর্বের মতো বাহির হয় কিংবা অন্তর্নিহিত সোরা কোন খারাপ লক্ষণ লইয়া আত্মপ্রকাশ করে; আর তাহার ফলে রোগের মূল ব্যাধি হ্রাসপাওয়া দূরে থাক তাহাকে অধিকন্তু যন্ত্রণাদায়ক অজীর্ণরোগ ও দুর্বলতা আশ্রয় করে। ঠিক এই প্রকারে সাধারণ চিকিৎসকগণ কোন চিররোগ নির্মল করিবার উদ্দেশ্যে যখন শরীরে চর্মের উপর ক্ষত উৎপাদন করেন তখন তদ্দ্বারা তাহাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হয় না। সেই উপায় অবলম্বন করিয়া তখনই তাহারা আরোগ্যদান করিতে পারেন না, যেহেতু চর্মের কৃত্রিম ক্ষত অন্তঃস্থিত ব্যাধি হইতে সম্পূর্ণ পৃথক ও বিসদৃশ। কিন্তু (ক্ষতজনিত) কতকগুলি কোষের উত্তেজনা অভ্যন্তরীণ পীড়ার বিসদৃশ হইলেও অন্তত কখন ও প্রবলতর হয়ে, সেইজন্য অভ্যন্তরীণ পীড়াও কখন তদ্দ্বারা দুই এক সপ্তাহ চুপ থাকে কিংবা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ইহা কেবল স্থগিত থাকে মাত্র এবং তাহাও খুব অল্প সময়ের জন্য। ইতিমধ্যে রোগীর শক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে। পেকলিন ও আরও অনেকেই স্বীকার করেন, ক্ষত উৎপাদন দ্বারা বহু বৎসর চাপা থাকলেও ক্ষত সারিবার মুখে মৃগীরোগ আবার ঠিক আবির্ভূত হয় এবং তাহা ও বর্ধিত আকারে।সাধারণ চিকিৎসায় নানা প্রকার নাম-না-জানা ব্যাধির জন্য ব্যবহৃত অজ্ঞাত মিশ্রণ সংবলিত প্রচলিত ব্যবস্থাপত্র অপেক্ষা এই সকল প্রয়োগ যথা, খোসচুলকানির জন্য জোলাপ, মৃগীর জন্য ক্ষত- নিশ্চয়ই অধিকতর বিরুদ্ধধর্মী, অধিকতর বিসদৃশ, অধিকতর ও বলক্ষয়কারী হইতে পারে না। ইহারা রোগীকে কেবল দুর্বল করা ছাড়া আর কিছুই করে না, আর রোগ নিরাময় করিতে না পারিয়া তাহাকে অল্পকালের জন্য দমন বা স্থগিত করিয়া রাখে মাত্র। আর সেগুলিকে দীর্ঘকাল ধরিয়া চালানো হইলে তার অবশ্যম্ভাবী ফল হয় মূল রোগের সহিত আর একটি নূতন পীড়ার সংযোগ।

বিসদৃশ পুরাতন পীড়ার সহিত নবাগত পীড়াটি যুক্ত হইয়া জটিল রোগের সৃষ্টি করে- কিংবা নবাগত ব্যাধিটি অনেকদিন ভোগ হওয়ার পরে অবশেষে বিসদৃশ পুরাতন ব্যাধিটির সহিত যুক্ত হইয়া একটি জটিল রোগ সৃষ্টি করে। তাহাদের প্রত্যেকে দেহের একটি বিশিষ্ট স্থান অর্থাৎ যেটির যেরূপ উপযুক্ত সেই সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অধিকার করিয়া বসে এবং বাকি অংশে অন্য বিসদৃশ রোগটিকে ছাড়িয়া দেয়। যেমন, একটি সিফিলিসরোগী সোরাগ্রস্থ হইতে পারে, কিংবা সোরাগ্রস্থ রোগী সিফিলিস দ্বারা সংক্রামিত হইতে পারে। কিন্তু ব্যাধি দুইটি পরস্পরের বিসদৃশ বলিয়া একটি অপরটিকে দূরীভূত কিংবা আরোগ্যদান করিতে পারে না । সোরার উদ্ভেদ যখন প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয় তখন সিফিলিসের লক্ষণ সমূহ স্থগিত এবং চাপা থাকে । পরে আবার ( সিফিলিস অন্তত সোরার সমান শক্তিশালী বলিয়া) তাহারা উভয়ে একত্রে মিলিত হয় অর্থাৎ প্রত্যেকটি সেই সকল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অধিকার করিয়া বলে যেগুলি তাহার উপযুক্ত, তাহার ফলে রোগী আরও পীড়িত হয় এবং তাহাকে রোগমুক্ত করা অধিকতর কষ্টসাধ্য হইয়া পড়ে। যখন দুইটি বিসদৃশ অচিরসংক্রামক ব্যাধি মিলিত হয়, যথা বসন্ত ও হাম, তখন একটি সাধারণত অপরদিকে চাপা দিয়া রাখে– ইহা পূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে । তথাপি এমন প্রচন্ড মহামারী দেখা গিয়াছে যেখানে বিরল হলেও দুইটি বিসদৃশ অঢিররোগের একই সঙ্গে একই দেহে আবির্ভাব ঘটিয়াছে এবং অল্প সময়ের জন্য উভয়ে একত্র মিলিত হইয়াছে বলিয়া বোধ হয়।

একই দেহে প্রাকৃতরোগসমূহ একত্র মিলিত হইয়া জটিলতা সৃষ্টি করার যে সম্ভাবনা তাহা অপেক্ষা দীর্ঘকাল ধরিয়া অনুপযুক্ত ঔষধ ব্যবহার দ্বারা অসঙ্গত চিকিৎসাব্যবস্থার ফলে ( এলোপ্যাথিক পদ্ধতি ) জটিল রোগ উৎপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখা যায়। যে প্রাকৃতিক ব্যাধিকে আরোগ্য করিবার জন্য ইহা ব্যবহার করা হয়, পুনঃপুনঃ প্রয়োগের ফলে সেই অনুপযুক্ত ওষধের প্রকৃতি অনুযায়ী উৎপন্ন এক নতুন, কষ্টসাধ্য রোগ তাহার সহিত সংযুক্ত হয়। উভয়ে ক্রমশ মিলিত হইয়া চিররোগকে জটিল করিয়া তোলে। ঔষধসৃষ্টপীড়া চিররোগটির বিসদৃশ, সুতরাং সদৃশ মতে আরোগ্যদান করিবার ক্ষমতা তাঁহার না থাকায় পুরাতন ব্যাধিটির সহিত আর একটি বিসদৃশ, কৃত্রিম দীর্ঘস্থায়ী নূতন পীড়া জুড়িয়া দিয়া রোগীর একটির স্থলে দুইটি পীড়া উৎপাদন করে অর্থাৎ তাহার ফলে রোগীর যন্ত্রণা আরও বাড়িয়া যায় এবং রোগ আরোগ্য করা দুঃসাধ্য, প্রায় অসাধ্য হইয়া পড়ে।চিকিৎসাসম্বন্ধীয় পত্রিকাদিতে যে সকল রোগের জন্য উপদেশ চাওয়া হয় এবং চিকিৎসাসম্পর্কিত লেখায় অন্যান্য যেসকল বিবরণী প্রকাশিত হয় সেগুলি ইহার সত্যতা বহন করে। ঠিক এইভাবেই প্রায় দেখা যায় উপদংশরোগের সহিত সোরা কিংবা অর্বুদযুক্ত গনোরিয়ার সংমিশ্রণজনিত জটিল পীড়া দীর্ঘকাল ধরিয়া পুনঃপুনঃ পারদঘটিত ঔষধের অযথা বৃহৎ মাত্রায় ব্যবহারেও আরোগ্য হয় না। বরং তাহা দেহের মধ্যে পারদঘটিত পুরাতন পীড়ার পাশেই নিজের স্থান করিয়া লয়। ইতিমধ্যেই বর্ধিত পারদঘটিত রোগের সংগে ইহা মিলিত হইয়া এক বিকট বীভৎস জটিল রোগ সৃষ্টি করে- যাহাকে সাধারণভাবে বলা হয় যৌনব্যাধি। তাহা তখন নিরাময় করা সম্পূর্ণ অসাধ্য যদি নাও হয় তাহা হইলেও অতি কষ্টেই তাহার আরোগ্য বিধান করা সম্ভব হয়।

পূর্বেই বলা হইয়াছে, প্রকৃতি দেবী নিজেও কোন কোন ক্ষেত্রে একই সময়ে দুইটি (তিনটিও) প্রাকৃতিক ব্যাধি একই দেহে স্থান লাভ করিতে দেন। ইহা লক্ষ্য করবার বিষয়, এইরূপ জটিলতা দুইটি বিসদৃশ রোগের পক্ষেই ঘটা সম্ভব, যাহারা প্রাকৃতিক অমোঘ নিয়মে একটি অপরটিকে দূর করিতে পারে না, ধ্বংস করিতে পারে না এবং নিরাময় করতে পারে না। কিন্তু দৃশ্যত উভয়ে ( কিংবা তিনটিতে) দেহের ভিতরে পৃথকভাবে বাস করে এবং সেই সকল অংশ ও যন্ত্রসমূহ অধিকার করিয়া বসে যেগুলি তাহাদের প্রত্যেকটির উপযুক্ত। এই সকল পীড়ার পরস্পরের মধ্যে কোন সাদৃশ্য না থাকায় এইরূপ ঘটা সম্ভব এবং তাহাতে জীবনসত্তার কোন হানি হয় না।

দুইটি সদৃশ রোগ যখন আসিয়া একত্র মিলিত হয় তখন ফল হয় কিন্তু বিভিন্ন। অর্থাৎ যেখানে পূর্ব হইতে উপস্থিত একটি রোগের সহিত অন্য একটি বলবত্তর সদৃশ রোগ যুক্ত হয় সে ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কেমনভাবে আরোগ্য সম্পাদিত হয় তাহা দেখিয়া কিরূপে আরোগ্য বিধান করা যায় আমরা শিক্ষা লাভ করি।

দুইটি সদৃশ পরস্পরকে বিদূরিত করিতে পারে না (যেমন বিসদৃশ রোগ সম্পর্কে প্রথম ক্ষেত্রে বর্ণিত হইয়াছে) কিংবা তাহাদের একটি অপরটিকে স্থগিত রাখিতে পারে না (যেমন বিসদৃশ রোগ সম্বন্ধে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখানো হইয়াছে) যাহাতে নূতন ব্যাধিটিরভোকাল শেষ হওয়ার পরে আবার পুরাতনটি আবির্ভূত হয়। তাহা ছাড়া দুইটি সদৃশ ব্যাধির (যেমন বিসদৃশ ব্যাধি সম্পর্কে তৃতীয় ক্ষেত্রে দেখানো হইয়াছে) একই দেহে পাশাপাশি অবস্থান করা কিংবা উভয়ে মিলিত হইয়া একটি জটিল রোগ উৎপন্ন করার সম্ভাবনাও দেখা যায় না

না! দুইটি ব্যাধি সমজাতীয় না হইলেও যদি প্রকাশ ও ক্রিয়া উৎপাদনে এবং যন্ত্রণা ও লক্ষণাদির স্ফুরণের তাহাদের উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য থাকে তাহা হইলে যখনই তাহারা দেহাভ্যন্তরে একত্র মিলিত হয় একটি অপরটির ধ্বংসসাধন করিয়া থাকে।

সদৃশ লক্ষণযুক্ত অন্যান্য বিধি কর্তৃক হোমিওপ্যাথি মতে রোগ নিরাময়ের অনেক দৃষ্টান্ত প্রাকৃত জগৎ হইতে দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য আরো কিছু নিশ্চিত ও সন্দেহাতীত বিষয় সম্বন্ধে বলা ও এমন কয়েকটি ব্যাধি সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টিনিবন্ধ করা যেগুলি বরাবর একইভাবে একই নির্দিষ্ট রোগবীজ হইতে উৎপন্ন এবং সেজন্য একটি সুস্পষ্ট নামে পরিচিত। ইহাদের মধ্যে নানা মারাত্মক লক্ষণযুক্ত ভীতিপ্রদ বসন্তরোগ একটি প্রধান স্থান অধিকার করিয়া আছে এবং তাহা সদৃশ লক্ষণযুক্ত অনেক পীড়াকে বিদূরিত ও আরোগ্যদান করিয়াছে। বসন্তরোগ কত ক্ষেত্রেই না চক্ষু প্রদাহ সৃষ্টি করিয়াছে, এমনকি অন্ধত্বও! কিন্তু দেখুন, বসন্তের টিকা দিয়া ডিজোটো ও লেরয় প্রত্যেকে একটি করিয়া পুরাতন চক্ষু ওঠা রোগ স্থায়ীভাবে সারাইয়াছিলেন। ক্লাইন বলেন মাথার চর্মরোগ চাপা পড়ার ফলে উৎপন্ন দুই বৎসরের স্থায়ী অন্ধত্ব ইহার (বসন্ত) দ্বারা সম্পূর্ণ নিরাময় হইয়াছে। বসন্তরোগের ফলে কত ক্ষেত্রেই না বধিরতা ও শ্বাসকষ্ট দেখা যায়! জে ক্লস দেখিয়াছিলেন, এই রোগের চরম অবস্থায় বহুদিনের পুরাতন ঐ দুইটি রোগ সারিয়ে গিয়াছিল। অণ্ডকোষফোলা, এমনকি প্রচন্ড ধরনের প্রায়ই বসন্তরোগে দেখা যায়। ক্লাইন লক্ষ্য করেন যে আঘাত জনিত বাম অন্ডকোষের একটি বৃহৎ শক্ত স্ফীতি সাদৃশ্যের জন্য ইহার দ্বারা আরোগ্যপ্রাপ্ত হইয়াছে ।অন্য একজন পর্যবেক্ষক ঐ ধরনের অন্ডকোষস্ফীতি ঐ রোগে সারিয়া যাইতে দেখিয়াছিলেন।

প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রাখিয়া নিশ্চিতভাবে, দ্রুত ও স্থায়ীরূপে আরোগ্যবিধান করিবার জন্য কোন্ জাতীয় ঔষধ নির্বাচন করা উচিত তাহা উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলি ছাড়া আর কিছুই সহজ ও সন্দেহাতীতভাবে চিকিৎসককে শিখাতে পারে না ।

উল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলি হইতে আমরা দেখিতে পাই, প্রাকৃতিক বিধানে কিংবা চিকিৎসকের নৈপুণ্যে-কোন প্রকারেই এবং কোন ক্ষেত্রেই উপস্থিত কোন ব্যাধিকে বিসদৃশ রোগশক্তি দ্বারা-তাহা যতই শক্তিশালী হোক না কেন দূরীভূত করা যায় না । কিন্তু চিরন্তন অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মে- এই পর্যন্ত স্বীকৃত হয় নাই-একটি সদৃশ এবং বলবত্তর শক্তি দ্বারা তাহা দূরীভূত হয়।

হোমিওপ্যাথিক রীতিতে এইরূপ যথার্থ প্রাকৃতিক আরোগ্যবিধান আমরা আরও অনেক দেখিতে পাইতাম যদি পর্যবেক্ষকগণ আরও বেশি মনোযোগসহকারে সেদিকে লক্ষ্য রাখিতেন এবং অপরপক্ষে আরোগ্যসহায়ক সদৃশ লক্ষণযুক্ত প্রাকৃতিক রোগ যদি এত কম না থাকিত ।

আমরা দেখিতে পাই যে শক্তিসম্পন্ন প্রাকৃতির কর্তৃত্বাধীনে সদৃশ রীতিতে আরোগ্য বিধান করিবার যন্ত্ররূপে সূক্ষ্ম রোগবীজজাত স্থায়ী ধরনের পিড়াসমূহ (খোসপাঁচড়া), হাম, বসন্ত প্রভৃতি রোগশক্তি ছাড়া আর বিশেষ কিছুই নাই। ভেষজরূপী সেই সকল ব্যাধি অত্যন্ত মারাত্মক এবং সেই জন্য যে রোগ সারাইবার জন্য তাহাদের প্রয়োগ করা হয় তাহা অপেক্ষা সেইগুলি আরও ভয়ঙ্কর অথবা সেগুলির প্রকৃতি এইরূপ (খোসপাঁচড়ার মতো ) যে রোগ সারাবার পরে তাহাদিগকেই নির্মল করিবার জন্য আবার চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। উল্লিখিত উভয় কারণেই সেগুলি হোমিওপ্যাথিক ঔষধরূপে ব্যবহৃত হওয়া কষ্টকর, অনিশ্চিত ও ভীতিপ্রদ। আর যে সকল ব্যাধি দ্বারা মানুষ আক্রান্ত হয় তাহাদের কয়টিই বা বসন্ত, হাম বা খোসপাঁচড়া রোগের ভিতরে তাহাদের সদৃশ আরোগ্যশক্তি খুঁজিয়া পাইবে? সেই জন্য প্রাকৃতিক বিধানে অতি অল্প কয়েকটি পিড়াই সেই সকল অনিশ্চিত, বিপদসঙ্কুল, হোমিওপ্যাথিক রোগশক্তি দাঁড়া নিরাময় হইতে পারে। তাহা ছাড়া, তাহাদের মাধ্যমে যে আরোগ্যবিধান তাহাতে আরও বিপদ ও যথেষ্ট অসুবিধার কারণ আছে। তাহার এই যে ঐ সকল রোগশক্তির মাত্রাকে ওষুধের মাত্রার মতো অবস্থাঅনুযায়ী কামাইতে পারা যায় না, অথচ অনুরূপ দীর্ঘস্থায়ী পীড়ায় আক্রান্ত রোগীকে বসন্ত, হাম বা খোসপাঁচড়ার মতো ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পীড়া সম্পূর্ণভাবে ভোগ করিতে হয় এবং সেই রোগকে পরে আবার সারাইতে হয়। তথাপি যাহা দেখা গিয়াছে তাহার শুভ যোগাযোগে হোমিওপ্যাথিক রীতি দ্বারা সম্পন্ন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হোমিওপ্যাথিক রীতি দ্বারা সম্পন্ন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আরোগ্যবিধান দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করতে পারে। সেগুলি প্রকৃতির সন্দেহাতীত প্রমাণ এবং তাহার মধ্যে এই শিক্ষা নিহিত আছে, সদৃশ লক্ষণ দ্বারা আরোগ্য বিধান কর ।

আবার ইহাও দেখা যায়, স্হূল প্রকৃতির খেয়াল খুশি মাফিক ক্রিয়া পদ্ধতি অপেক্ষা মানুষ কত বেশি সুবিধার অধিকারী। সমস্ত জগতে কত সহস্র সহস্র সদৃশ রোগ উৎপাদনকারী ভেষজদ্রব্য রহিয়াছে যেগুলি মানুষের আয়াত্তাধীনে পীড়িত মানবকে আরোগ্যের জন্য ব্যবহৃত হইতে পারে। তাহাদের মধ্যে খুঁজিয়া পাওয়া যায় সকল প্রকার সম্ভাব্য ক্রিয়াসমন্বিত রোগ উৎপাদক শক্তি,। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার জন্য যাহা ধারণাগম্য ও ধারণাতীত অসংখ্য প্রাকৃতিক পিড়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্ত হইতে পারে। ঐ সকল রোগ উৎপাদক ভেষজসমূহের আরোগ্যবিধায়ক ক্রিয়া শেষ হইলে তাহাদের শক্তি জীবনীশক্তি দ্বারা পরাভূত হয় এবং নিজে নিজেই মিলাইয়া যায়। খোসপাঁচড়ার মতো তাহাদিগকে তারাইবার জন্য আর দ্বিতীয়বার চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। সেগুলিকে (ভেষজ) চিকিৎসক চূর্ণীকৃত ও বিভাজিত করিয়া অসীমশক্তির আধাররূপে পরিণত করিতে পারেন এবং তাহাদের মাত্রাকে তিনি এরূপ পরিমাণে হ্রাস করিতে পারেন যে, যে সদৃশ রোগকে সারাইবার জন্য তাহা প্রয়োগ করা হয় তদপেক্ষা (সেইমাত্রা) কিছু বেশি শক্তিশালী অবস্থায় থাকে। তাহার ফলে, এই অতুলনীয় চিকিৎসাপদ্ধতিতেই পুরাতন দুরারোগ্য ব্যাধির মূলোৎপাটন করিবার জন্য দেহের উপর প্রচন্ড প্রতিক্রিয়া আনার প্রয়োজন হয় না। এই প্রণালীতে আরোগ্যলাভ ঘটে শান্তভাবে ও অজ্ঞাতসারে অথচ অনতিবিলম্বে যন্ত্রণাদায়ক প্রাকৃতিক পীড়াকে বাঞ্ছিত স্হায়ী সুস্থতায় রূপায়িত করে।

যাহাকে হোমিওপ্যাথিক রীতি বলা হয় (ইচ্ছাপূর্বক এই শব্দটি পূর্বে আমরা কখন ও ব্যবহার করি নাই) এবং দ্বিতীয়টি হলো হেটারোপ্যাথিক বা এলোপ্যাথিক পদ্ধতি যাহাতে এসব কিছু করা হয় না। একটি অপরটির বিপরীত; যিনি দুইটির একটিকেও জানেন না তাহারই এই ভ্রান্তি আসা সম্ভব যে দুইটি পদ্ধতি পরস্পর মিলিত হইয়া পরস্পরের সহিত যুক্ত হতে পারে। তিনিই রোগীর ইচ্ছানুসারে একসময়ে হোমিওপ্যাথিকমতে, অন্য সময়ে এলোপ্যাথিক চিকিৎসা করিয়া নিজেকে হাস্যাস্পদ করেন। এইরূপ চিকিৎসাকে অনুপম হোমিওপ্যাথির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধ বলা যাইতে পারে।

অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তসূত্রে আমরা দেখিয়েছি (৭-২৫) যে ইহা নিঃসন্দেহে ঠিক পথ যাহার অনুসরণে কলানৈপুণ্যের ভিতর দিয়া সর্বাপেক্ষা দ্রুত, সুনিশ্চিত ও স্থায়ী আরোগ্যলাভ সম্ভব; যেহেতু এই আরোগ্যকলা প্রকৃতির এক চিরন্তন অভ্রান্ত নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশুদ্ধ হোমিওপ্যাথিক আরোগ্যকলাই একমাত্র নির্ভুল পদ্ধতি, মানুষের কলাকৌশলসাধ্য, আরোগ্যলাভের সরলতম পথ, দুইটি নির্দিষ্ট বিন্দু মধ্যে একটি মাত্র সরল রেখার ন্যায় ধ্রুব।

এলোপ্যাথিক চিকিৎসা প্রণালীতে রোগের বিরুদ্ধে অনেক কিছুই ব্যবহৃত হয়, কিন্তু সাধারণত সেগুলি অনুপযুক্ত এবং বহুকাল ধরিয়া ইহারা নানাপ্রকার পদ্ধতি নামে অভিহিত হইয়া আধিপত্য বিস্তার করিয়া চলিয়াছে। ইহাদের প্রত্যেকটি এক এক সময়ে বিশেষভাবে আকার বদলাইয়া যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসাপদ্ধতি বলিয়া নিজেকে গৌরবদান করিয়াছে। এইরুপ পদ্ধতির প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠাতাই নিজের সম্বন্ধে মানবের অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে প্রবেশ করিয়া তাহার সুস্পষ্ট পরিচয় পাইয়াছেন এবং কোন দূষিত বস্তু রোগীর দেহ হইতে বিদূরিত করিতে হইবে এবং তাহার স্বাস্থ্য ফিরাইয়া আনিবার জন্য কিভাবে তাহা করিতে হইবে তদনুসারে তিনি ব্যবস্থাপত্র দিয়াছেন। প্রকৃতির কাছে সরলভাবে জিজ্ঞাসু না হইয়া এবং সংস্কারমুক্ত চিত্তে অভিজ্ঞতার শিক্ষা না লইয়া তাহার এই সকল ব্যবস্থা হইল অসার কল্পনা ও মনগড়া অনুমানপ্রসূত ব্যাধিসমূহকে প্রায় একইভাবে পুনরাবর্তিত অবস্থা বলিয়া হইত। তদনুযায়ী অধিকাংশ পদ্ধতিতেই তাদের কল্পনাগড়া ব্যাধিচিত্তের একটি করিয়া নাম দেওয়া হইত এবং প্রত্যেকটি পদ্ধতিকে বিভিন্ন শ্রেণী বিভাগের মধ্যে ফেলা হইত। ঔষধসমূহের উপর এমন কতকগুলি ক্রিয়া আরোপ করা হইত যাহা সেই সকল অস্বাভাবিক অবস্থা দূর করিতে পারিবে বলিয়া মনে করা হইত। (তাহা হইতে মেটেরিয়া মেডিকা বিষয়ে এত বেশি পাঠ্য পুস্তকের উৎপত্তি) ।

শীঘ্রই কিন্তু সাধারণের এই বিশ্বাস জন্মিলযে এই সকল প্রণালী ও পদ্ধতির প্রত্যেকটি যথাযথ প্রবর্তিত হওয়ার ফলে রোগীর যন্ত্রণা বাড়িয়া চরম সীমায় উঠে। হাতুড়েপদ্ধতি দ্বারা আবিষ্কৃত এই সকল ঔষধ দ্বারা কখন ও কখন ও সাময়িক উপশম যদি পাওয়া না যায়ত এবং তৎক্ষণাৎ তাহার আরামপ্রদ ক্রিয়া রোগীর অনুভবগম্য না হইত তাহা হইলে অনেক আগেই এই সকল এলোপ্যাথিক চিকিৎসককে বিদায় লইতে হইত। এই সকলের জন্যই কিয়ৎ পরিমাণে তাহাদের মান রক্ষা পাইয়াছে।

সতেরো শতাব্দি ধরিয়া গেলেনেরপ্রবর্তিত সাময়িক উপশমদায়ক – বিপরীতকে বিপরীত দিয়া চিকিৎসা (অ্যান্টিপ্যাথি, এনান্টিওপ্যাথি) শিক্ষালাভ করার ফলে চিকিৎসকগণ আশু উপশম প্রদানের ছলে লোকের বিশ্বাসভাজন হইবার করিয়াছিলেন।কিন্তু মূলে এই পদ্ধতি কত সাহায্যে অক্ষম ও ক্ষতিজনক (চিররোগে) তাহা পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখিতে পাইব। এলোপ্যাথগণের অনুসৃত চিকিৎসা প্রণালীর মধ্যে ইহা নিশ্চয়ই একটি যাহার সহিতপ্রাকৃতিক রোগ লক্ষণের একাংশের সুস্পষ্ট আছে; কিন্তু কি জাতীয় সম্বন্ধ? বাস্তবিকই ঠিক সেইটি (ঠিকেরই যথার্থ বিপরীত) যেটিকে সতর্কতার সহিত পরিহার করে চলা উচিত- যদি আমরা চিররোগগ্রস্ত রোগীর সম্বন্ধে ছলনা বা তামাশা করিতে না চাই।

এই ধরনের অসমলক্ষণ প্রথায় চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করার জন্য সমগ্র রোগলক্ষণের মধ্যে সবচাইতে কষ্টকর লক্ষণটি লইয়া অন্যান্য লক্ষণগুলি অবজ্ঞা করা হয়। সাধারণ চিকিৎসক এই যন্ত্রণাদায়ক লক্ষণটি দূর করার জন্য, বিপরীত লক্ষণ মতে চিকিৎসা কার্য পরিচালনা করেন এবং উক্ত ঔষধ রোগলক্ষণের বিপরীত অবস্থা উৎপাদন করেন বলিয়া তিনি অবগত আছেন। এইভাবে ঔষধ নির্বাচনের পর তিনি অতিসত্বর উপকারের আশা করেন। সব ধরনের যন্ত্রণার অবসানের জন্য তিনি অতি মাত্রায় আফিম প্রয়োগ করেন। কেননা আফিম সত্ত্বর অনুভব শক্তিকে বিনষ্ট করিয়া ফেলে। এই ঔষধটি সব রকমের তরল ভেদে ব্যবহার করা হয়। কারণ ইহা শীঘ্রই অন্ত্রনালীর মল সঞ্চালন গতি রোধ করে এবং উহার অবসাদ আনিয়া দেয়। অবসাদকর অচেতন নিদ্রা আনয়ন করে বলিয়া নিদ্রাহীনতার জন্যও এই ঔষধটি দেওয়া হয়। কারণ আফিম অতিশীঘ্র মস্তিষ্কের অবসাদসূচক অচৈতন্যাবস্থায়কর নিদ্রা উৎপাদন করে। এই পদ্ধতির চিকিৎসক কোষ্ঠকাঠিন্য হলে জোলাপ দেন হাত পুড়িয়া গেলে ঠাণ্ডা জলে রোগীর হাত ডুবাইয়া দেন। ইহাতে জলের শীতলতার জন্যই পোড়ার জ্বালা আশু নিবারিত হয়। রোগী যখন উত্তাপহীনতার জন্য শীতবোধ করে তখন তাকে গরম জলে স্নান করান যেন তাহার শরীর গরম হইয়া উঠে। দীর্ঘদিনের দুর্বলতার জন্য মদের ব্যবস্থা করেন, যাহাতে রোগী মুহূর্তের মধ্যে সবল ও প্রফুল্ল হয়ে উঠে। এইভাবে আরও অনেক গুলি বিপরীত ক্রিয়া সৃষ্টিকারী ঔষধ ব্যবহার করেন কিন্তু উক্ত ঔষধগুলি ছাড়া তাহার আর অল্পই জানা আছে। কারণ খুব অল্প সংখ্যক ঔষধেরই বিশেষ ক্রিয়া (প্রাথমিক) সাধারণ তন্ত্রে জানা আছে।

এই প্রকার পদ্ধতিতে চিকিৎসার মূল্য নিরূপণ করিতে যাইয়া ইহা যে একটি অত্যন্তযুক্ত লাক্ষনিক পদ্ধতি-যাহাতে চিকিৎসক সমগ্র লক্ষণের মধ্যে কেবলমাত্র একটি লক্ষণ এর দিকেই ঝোঁক দেন এবং সেজন্য রোগীর প্রার্থিত সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভের আশা পূর্ণ হয় না-সে বিষয়ে ছাড়িয়া দিলেও অপরপক্ষে আমাদের অভিজ্ঞতা ইহাই কি আমাদিগকে জানাই না যে এন্টি প্যাথিক পদ্ধতিতে চিররোগে ঔষধ প্রয়োগ দ্বারা প্রথমে সাময়িক উপশমের পরে আবার সমগ্র পীড়ার বৃদ্ধি ঘটিয়া থাকে? প্রত্যেক মনোযোগী দ্রষ্টাই স্বীকার করিবেন যে অ্যান্টিপ্যাথিক সাময়িক উপশমের পর প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আসিয়াছে বৃদ্ধি, যদিও সাধারণ চিকিৎসক সেই পরবর্তী বৃদ্ধির কারণ রোগীকে অন্যভাবে বুঝাইয়া দেন এবং বলেন যে এই বৃদ্ধির প্রাথমিক রোগের মারাত্মক অবস্থার একটা প্রথম প্রকাশ অথবা অন্য কোন নুতন পীড়া ।

এই প্রকার সাময়িক উপশমদায়ক বিরুদ্ধধর্মী ঔষধ দ্বারা চিকিৎসায় স্থায়ী রোগের লক্ষণসমূহের কয়েক ঘণ্টা পরেই পুনরাবির্ভাব, তখন বিড়াল স্পষ্ট বিদ্রূপ বিপরীত অবস্থা আসা ছাড়া আর কিছুই হয় না। দিনের বেলায় অনবরত নিদ্রালুতার জন্য চিকিৎসক কফির ব্যবস্থা করেন। ইহার প্রাথমিক ক্রিয়া হইল সতেজতা আনায়ন করে। ইহার ক্রিয়া শেষ হইয়া গেলে দিবানিদ্রালুতা আবার বাড়িয়া যায়। রোগের অন্যান্য লক্ষণের দিকে দৃষ্টি না দিয়া রাত্রের অনিদ্রার জন্য সন্ধ্যার সময় আফিম ব্যবস্থা করা হয়। তাহার প্রাথমিক ক্রিয়ায় সেইরাত্রে একটা আচ্ছন্নভাব আসলেও পরবর্তী রাত্রিগুলিতে পূর্বাপেক্ষা অধিকতর জাগরনে কাটাইতে হয়। অন্যান্য রোগলক্ষণের দিকে মনোযোগ না দিয়া পুরাতনয উদারাময়কে বন্ধ করিবার জন্য সেই আফিম আবার দেওয়া হয়। তাহার প্রাথমিক ক্রিয়ার ফল হইল কোষ্ঠবদ্ধতা,উদারাময় সাময়িকভাবে বন্ধ থাকার পরে তাহা আবার খারাপ ভাবে দেখা দেয়। বিভিন্ন প্রকারের প্রচণ্ড যন্ত্রণার পুনঃপুনয়আক্রমণে আফিম দিয়া অল্প সময়ের জন্য তাহা দমন করা হইল অধিকতরভাবে, কখন ও অসহনীয়তীব্রতায় তাহা ফিরিয়া আসে কিংবা তাহা অপেক্ষা আরও খারাপ ব্যাধি তাহার স্থানে আসিয়া জোটে। দীর্ঘস্থায়ী রাত্রিকালীন কাশির জন্য সাধারণ চিকিৎসাক আফিম ছাড়া আর কিছুরই ব্যবস্থা জানেন না। আফিমের প্রাথমিক ক্রিয়ায় হইলো সকল প্রকার উত্তেজনাকে দমন করা, সেজন্য প্রথম রাত্রে কাশি হয়তো বন্ধ থাকে, কিন্তু পরবর্তী রাত্রিসমূহে তাহা আর ও প্রচন্ডভাবে দেখা দেয়। আরও অধিকতর মাত্রায় ব্যবহার করিয়া যদি পুনঃপুন তাহা দমন করা হয় তাহা হইলে জ্বর ও নিশার্ঘম আসিয়া তাহার সহিত যুক্ত হয়। মূত্রাশয়ের দুর্বলতা ও তৎসহ মুত্রাবরোধের প্রতিকারের জন্য এন্টিপ্যাথিক পদ্ধতিতে ক্যান্হারাইডিসপ্রয়োগ করিয়া মূত্রনালী সমূহকে উদ্দীপনা দিবার চেষ্টা করা হয়। তাহার ফলে প্রথমে মূত্রের নিঃসরণ ঘটিলেও পরে মূত্রাশয়কে আর ক্রিয়াশীল করিবার জন্য সম্ভাবনা থাকে না, সেই জন্য তাহার সংকোচন মন্দীভূত হওয়ার পক্ষাঘাত আসন্ন হইয়া পড়ে। বৃহৎ মাত্রায় জোলাপ দিয়া পুনঃপুন মলত্যাগের উত্তেজনা সৃষ্টি করিয়া পুরাতন কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করিবার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তাহার গৌণ ক্রিয়ার ফলে কোষ্ঠবদ্ধতা আরো বাড়িয়া যায়। সাধারণ চিকিৎসক বহুদিনের স্থায়ী দুর্বলতাকে দূর করিবার জন্য মদ্য ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। প্রাথমিক ক্রিয়ায় তাহা সলতা আনিলেও প্রতিক্রিয়া অধিকতর অবসন্নতা লইয়া আসে। তিক্ত ভেষজ ও গরম মসলা দ্বারা পাকস্থলীর বহুদিনের স্থায়ী নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বলতাকে সতেজ ও করিবার চেষ্টা করা হয়,কিন্তু এই প্রাথমিক উপশমের প্রতিক্রিয়ায় পাকস্থলী আর ও নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়ে। বহুদিন স্থায়ী দৈহিক উত্তাপ এর অভাব এবং উষ্ণস্নানে উপশম হয়, কিন্তু পরে রোগী অধিকতর দুর্বল, শীতল ও শীতকাতর হইয়া পড়ে। গুরুতরভাবে দুগ্ধ স্থানে শীতল জল প্রয়োগ করিলে সঙ্গে সঙ্গে উপশম বোধ হয় বটে কিন্তু দুগ্ধযন্ত্রণাপরে অবিশ্বাস্য রূপে বাড়িয়া যায় এবং প্রদাহ আরও অধিকস্থান লইয়া বিস্তৃত হয়। যে সকল ঔষধে হাঁচি জন্মাইয়া সর্দি নিঃসরণ করে সেই পোকার ঔষধ প্রয়োগে বহুদিনের স্থায়ী সর্দিতে নাক বন্ধ থাকা অবস্থা দূর করিবার ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু এই সকল বিরোধের প্রতিক্রিয়ায় অসুখ যে আরও বাড়িয়া যায় তাহা নজরে আসে না, নাক আরও বেশি বন্ধ হইয়া যায়। তড়িৎশক্তির প্রাথমিক ক্রিয়া হইল পেশীসমূহকে উদ্দীপিত করা। এই শক্তির ক্রিয়ায় বহুদিনের দুর্বল, প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গকে অতি দ্রুত ক্রিয়াশীল করা হয়, কিন্তু তাহার গৌণ ফল হইল পেশী সমূহের সকল উত্তেজনার স্তব্ধতা ও সম্পূর্ণ পক্ষাঘাত। শিরা কাটিয়া মস্তকের স্থায়ী রক্ত সঞ্চয় দূর করিবার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু তাহার ফলে রক্ত সঞ্চয় আর ও বেশী হইয়া থাকে। বিভিন্ন প্রকারের টাইফয়েডরোগে দেহযন্ত্র ও মনের যে অসাড়তা ও সেই সঙ্গে অচৈতন্য অবস্থা দেখা যায় তাহার চিকিৎসার জন্য সাধারণ চিকিৎসকগণের অধিকমাত্রায় ভ্যালেরিয়ান প্রয়োগ ছাড়া বিশেষ আর কিছু জানা নাই। কারণ সতেজতা প্রদান করিতে ও স্নায়ুতন্ত্রের গতিশীলতা বৃদ্ধি করে যে সকল ওষুধের ক্ষমতা সার্বাধিক ইহা তাদের অন্যতম। অজ্ঞানতাবশত তাহারা জানেন না যে এই ক্রিয়া প্রাথমিক মাত্র এবং তাহা অন্তর্নিহিত হইলে দেহযন্ত্র সুনিশ্চিতভাবে বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া কবলে পড়ে ও অধিকতর চেতনা হীনতা ও অসারতা আশিয়া দেখা দেয় অর্থাৎ ফলে হয় মানসিক ও দৈহিক পক্ষাঘাত, মৃত্যু। তাহারা লক্ষ্য করেন নাই যে, যেসকল রোগে বিপরীত ক্রিয়াশীল ভ্যালেরিয়ান প্রচুর পরিমাণে দিয়াছেন সেগুলির সুনিশ্চিত পরিমাণ হইয়াছে মৃত্যু। পুরাতনপন্থী চিকিৎসকগণ এই মনে করিয়া আনন্দ বোধ করেন যে, রক্তাভ ফক্সগ্লভের প্রথম মাত্রা প্রয়োগ করিয়াই (যাহার প্রাথমিক ক্রিয়া হইল নাড়ির গতিকে মন্দীভূত করা) রক্তহীন নাড়ীর গতিবেগকে কয়েক ঘণ্টার জন্য মন্হর করিয়া দিতে পারেন। কিন্তু ইহার বেগ আবার শীঘ্র ফিরিয়া আসে। পুনঃপুন মাত্রা বাড়াইয়া ক্রমশ অল্প অল্প বেগ কমতে কমতে শেষে আর উপকার হয় না। বস্তুত প্রতিক্রিয়ায় নাড়ির গতি এত দ্রুত হয় যে গনিয়া উঠিতে পারা যায় না; নিদ্রা, ক্ষুধা, বল চলিয়া যায়, অতি দ্রুত অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু ঘনাইয়া আসে, আর নয়তো উন্মাদরোগ দেখা যায়। এক কথায়, এই প্রকার বিরুদ্ধ চিকিৎসার (অ্যান্টিপ্যাথিক) প্রতিক্রিয়ার ফলে কতবার ব্যাধির বৃদ্ধি হয় এবং খারাপ অবস্থা ঘটে মিথ্যা কল্পনাময় পুরাতনপন্থী চিকিৎসায় তাহার অনুভব হয় না, কিন্তু অভিজ্ঞতা ইহা ভয়ঙ্করভাবে শিখাইয়া দেয়।

এই সকল কুফল (যাহা স্বভাবতই অ্যান্টিপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগে উৎপন্ন হয়) উপস্থিত হইলে সাধারণ চিকিৎসক মনে করেন যে,প্রতিবার বৃদ্ধির সময় ঔষুধের আরো একটু চড়া মাত্রা দিলে সেই অসুবিধা অতিক্রম করা যাইবে। তদ্দ্বারা সমানভাবেই রোগকে কিছুকাল চাপা দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু ক্রমশই ঔষধের মাত্রা আরও বাড়াইয়া উপশম দিবার প্রয়োজন হয়। তাহার ফলে আর একটি অধিকতর কঠিন রোগের সূত্রপাত হয় কিংবা রোগ প্রায়ই আরোগ্যের বাহিরে চলিয়া যায়, জীবনের আশঙ্কা আসে, এমনকি মৃত্যু ঘটে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রোগকে তদ্দ্বারা কখনও আরোগ্য হইতে দেখা যায় না।

বিপরীত পদ্ধতিতে ঔষধ প্রয়োগ করিলে যে বিষাদময় ফল হয় সে সম্বন্ধে চিকিৎসকগণের যদি চিন্তা করিয়া দেখিবার ক্ষমতা থাকিত তাহা হইলে তাহারা এই মহান সত্য বহুকাল পূর্বেই আবিষ্কার করিতে পারিতেন যে প্রকৃত আরোগ্য করা অ্যান্টিপ্যাথিক চিকিৎসার ঠিক বিপরীত পদ্ধতিতেই (অর্থাৎ সদৃশ পদ্ধতিতেই) পাওয়া সম্ভব। তাহারা নিঃসন্দেহ হইতে পারিতেন যে রোগলক্ষণের বিপরীত পদ্ধতিতে ঔষধ প্রয়োগের ফলে আসে ক্ষণিকের উপশম এবং তাহা কাটিয়া গেলে দেখা যায় রোগের অবশ্যম্ভাবী বৃদ্ধি এবং তাহার উল্টা পদ্ধতিতে অর্থাৎ হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতিতে লক্ষণের সাদৃশ্য ঢাকায় স্থায়ীভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে রোগ মুক্তি সম্ভব, অবশ্য যদি অ্যান্টিপ্যাথিক স্থূল মাত্রার পরিবর্তে সূক্ষ্মমাত্রার সেই সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আন্টিপ্যাথিক চিকিৎসার ফলে ঘটে স্পষ্টভাবে রোগের বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপত্রে দৈবক্রমে হোমিওপ্যাথিক সম্বন্ধবিশিষ্ট কোন ঔষধ মুখ্যত উপস্থিত না থাকিলে চিকিৎসকের পক্ষে কখনো কোন দীর্ঘস্থায়ী রোগ সম্পূর্ণ আরোগ্য করা সম্ভবপর নহে, অথবা প্রাকৃত জগতে এই যাবত যেসকল আরোগ্যলাভ দ্রুত ও সম্পূর্ণরূপে ঘটিয়াছে তাহা যে সর্বদা পুরাতন ব্যাধির উপর আরেকটি সদৃশ রোগ উৎপন্ন করিয়া, এই সকল তথ্য হইতে এই দীর্ঘ শতাব্দী ধরিয়াও তাঁহারা সেই সত্য উপলব্ধি করিতে পারেন নাই তাহা জানা থাকিলে প্রকৃতই রোগীর কল্যাণসাধন সম্ভব।

ক্ষণিক উপশমকারী এন্টিপ্যাথিক চিকিৎসার অনিষ্টকর ফল এবং তাহার বিপরীত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় সুফল কিসের উপর নির্ভর করে তাহা নিম্নলিখিত– গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইয়াছে এবং সেই সকল স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলেও আরোগ্য বিধানের জন্য তাকে অপরিসীম প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন নাই।—-ইউরোপ ও অন্যান্য স্থানের চিকিৎসকগণ সকল রোগের জন্য এই সুবিধাজনক চিকিৎসা পদ্ধতিকে গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তাহার মুখ্য কারণ হইলো ইহাতে বড় একটা ভাবনা চিন্তার দরকার হয়না। (যাহা পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা কঠিন কাজ) । বিবেকের দংশন হইতে মুক্তি ও নিজেদেরসান্তনার জন্য এইটুকু শুধু অবহিত হওয়া প্রয়োজন মনে করিতেন যে তাহারা নিজে এই চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কর্তা নহেন এবং সহস্র সহস্র ব্রুসোপন্হী সেই একই পদ্ধতিতে চলেছেন, আর তাহাদের গুরুর শিক্ষা হইল এই যে, যেভাবেই হোক মৃত্যুর পর সব স্তব্ধ হইয়া যায়। এইরূপে বহু সহস্র চিকিৎসক শোচনীয়ভাবে তাহাদের রোগীদের উষ্ণ রক্ত নির্মমভাবে মোক্ষণ করিবার ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হইয়াছেন। লক্ষ লক্ষ রোগী, যাহাদিগকে আরোগ্য দান করা সম্ভবপর হইতে ব্রুসোর পন্থা অনুসরণ করিয়া ক্রমশ তাহাদের প্রাণ হরণ করা হইয়াছে। তাহাদের সংখ্যা নেপোলিয়নের যুদ্ধক্ষেত্রে যত লোক নিহত হইয়াছে তাহা অপেক্ষা বেশি। যে চিকিৎসা দ্বারা চিকিৎসাযোগ্য সকল রোগী সর্বাপেক্ষা কঠিন চিকিৎসা কলাকৌশল এবং অক্লান্ত কর্মী, বিশ্লেষণদক্ষ চিকিৎসকের বিশুদ্ধ বিচার বুদ্ধির সাহায্যে লইয়া স্বাস্থ্য এবং নবজীবন লাভ করিতে পারে, সেই একমাত্র প্রকৃত বিজ্ঞান ও কলা সম্মত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার পৃথিবীর সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে পারে, সেই জন্যই কি ভগবৎ বিধান অনুসারে আরোগ্য দানযোগ্য রোগীগণের মৃত্যু আনয়নকারী ব্রুসোরচিকিৎসা পদ্ধতির হোমিওপ্যাথির পূর্ববর্তী হওয়া প্রয়োজন ছিল?

জীবনে শক্তির উপর ক্রিয়াশীল প্রত্যেকটি বস্তু,প্রত্যেকটি ওষুধ জীবনী শক্তিকে অল্পাধিক বিপর্যস্ত করে এবং তার ফলে দীর্ঘকাল কিংবা স্বল্প সময়ের জন্য ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের কিছু পরিবর্তন ঘটায়। ইহাকে মুখ্য ক্রিয়া বলা হয়। যদিও ইহা ঔষধ ও জীবনীশক্তির ক্রিয়ার সম্মিলিত ফল তথাপি ইহার প্রধান হেতু হইল ঔষধ শক্তি। এই ক্রিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের জীবনীশক্তি তাহার নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করিবার চেষ্টা করে। এই যে প্রতিরোধ ক্রিয়া তাহা বস্তুত আমাদের আত্মরক্ষা শক্তিরই স্বধর্ম ও তাহা স্বয়ংক্রিয় এবং তাকে বলা হয় গৌন ক্রিয়া বা প্রতিকূল ক্রিয়া ।

আমাদের সুস্থ শরীরের উপর কৃত্রিম রোগ উৎপাদক বস্তুসমূহের অর্থাৎ ওষুধেরমুখ্য ক্রিয়া প্রকাশকালে নিম্নলিখিত পন্হানুসার আমাদের জীবনীশক্তিকেএরূপভাবে আচরণ করতে দেখা যায় যেন তাহা কৃত্তিম বহিঃশত্রুর আক্রমণ নিশ্চেষ্টভাবে আগে নিজের উপর গ্রহণ করিয়া নিজের স্বার্থকে প্রবর্তিত হইতে দিতে বাধ্য হইতেছে। তাহার পর যেন পুনরায় নিজেকে উদ্বুদ্ধ নিজের সাধ্যানুযায়ী ও কৃত্তিম ঔষধ জনিত মুখ্য ক্রিয়ার সমপরিমানে (ক) মুখ্য ও ক্রিয়ার ঠিক বিপরীত স্বাস্থ্যের অবস্থা আনয়ন করে (প্রতিকূল ক্রিয়া, গৌণ ক্রিয়া)—যদি বিপরীত অবস্থা বলিয়া কিছু থাকে, (খ) কিংবা, মুখ্য ক্রিয়ার কোন বিপরীতপ্রাকৃতিক অবস্থা যদি না থাকে তাহা হইলে নিজেকে স্বতন্ত্র করিয়া লইবার চেষ্টা করে অর্থাৎ স্বীয় বলবত্তর শক্তি প্রয়োগ করিয়া ঔষধ জনিত পরিবর্তনকে বিদূরিত করিয়া তাহার স্থানে স্বাভাবিক অবস্থা পুনঃস্থাপিত করে ( গৌন ক্রিয়া, আরোগ্যবিধায়িনী ক্রিয়া।)

ক) অংশের সিদ্ধান্ত সমূহ সকলের পরিচিত। গরম জলে ডুবানো হাতটি অন্য হাতটি অপেক্ষা প্রথমে বেশি গরম বলিয়া বোধ হয়( মুখ্য ক্রিয়া), কিন্তু তাহা গরম জল হইতে উঠাইয়া ভালো করিয়া শুকাইয়া লইলে অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহা ঠান্ডা এবং পরে অন্য হাত অপেক্ষা অধিকতর ঠান্ডা বলিয়া অনুভূত হয় (গৌণক্রিয়া)। অতিরিক্ত পরিশ্রমের পরে দেহে গরম বোধ হয় (মুখ্য ক্রিয়া), কিন্তু পরে ঠান্ডা বোধ হয় ও কাঁপুনি লাগে (যৌনক্রিয়া)। যে লোক গতকাল অত্যধিক মদ খাইয়া উষ্ণ করিয়াছিল (মুখ্য ক্রিয়া) আজ তাহার প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যারপরনাই ঠান্ডা বলিয়া বোধ হইতেছে (প্রতিক্রিয়া, গৌণ ক্রিয়া)। যে বাহুকে অনেকক্ষণ ধরিয়া খুব শীতল জলে ডুবাইয়া রাখা হইয়াছেতাহা প্রথমে অধিকতর ফ্যাকাসে ও শীতল বলিয়া বোধ হয় (মুখ্য ক্রিয়া) কিন্তু ঠান্ডা জল হইতে সরাইয়া লইয়া জল মুছে ফেলিলে তাহা পরে অন্য বাহু অপেক্ষা অধিকতর উষ্ণই শুধু হয় না বরং উত্তপ্ত, লাল ও প্রদাহান্বিত হইয়া উঠে (গৌণ ক্রিয়া, জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া) । কড়া কফি পান করিলে অত্যাধিক স্ফুর্তি আসে (মুখ্য ক্রিয়া), কিন্তু পরে আলস্য ও তন্দ্রালুতা অনেকক্ষণ ধরিয়া বিদ্যমান থাকে (প্রতিক্রিয়া, গৌণ ক্রিয়া) যদি না আবার নতুন করিয়া কফি পান করিয়া তাহা (ক্ষণিকের জন্য) তারাইয়া দেওয়া হয় (উপশমকারী) । আফিম সেবনজনিত জড়বৎ অঘোর নিদ্রার (মুখ্য ক্রিয়া) পরে পরবর্তী রাত্রে আসে অধিকতর নিদ্রাহীনতা (প্রতিক্রিয়া, গৌণ ক্রিয়া) । আফিম সেবনজনিত কোষ্ঠবদ্ধতা পরে (মুখ্য বা প্রাথমিক ক্রিয়া) উদারাময় আসে (গৌণ ক্রিয়া), আর অন্ত্রের উত্তেজনাজনক জোলাপ দিয়া কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করিয়া পরে (মুখ্য বা প্রাথমিক ক্রিয়া) কয়েকদিনব্যাপী কোষ্ঠবদ্ধতা শুরু হয় (গৌণ ক্রিয়া )। এইরূপ সব সময়ই ঘটে, সুস্থ দেহে অধিক মাত্রায় ঔষধ প্রয়োগের ফলে স্বাস্থ্যে গুরুতর পরিবর্তন আসার পরে যদি তাহার ঠিক বিপরীত অবস্থা থাকে, যেরূপ আলোচিত হইয়াছে, তাহা জীবনীশক্তি কর্তৃক গৌন ক্রিয়ার ভিতর দিয়ে প্রতিফলিত হয়।

সুস্থ দেহের উপর বিশৃঙ্খলা উৎপাদনকারী কোন ঔষধের অতি ক্ষুদ্র হোমিওপ্যাথিক মাত্রায় ক্রিয়ার একটি বিপরীত প্রতিক্রিয়া খুব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হইবে বলিয়া ধারণা হতে পারে, কিন্তু তাহা হয় না। প্রত্যেকটি ঔষধের ক্ষুদ্রমাত্রা নিশ্চিতভাবে যে প্রাথমিক ক্রিয়া উৎপাদন করে তাহা খুব মনোযোগী পর্যবেক্ষকের কাছে ধরা পড়ে বটে কিন্তু জীবন্তদেহ স্বাভাবিক অবস্থা পুনরানয়নের জন্য যতটুকু প্রতিক্রিয়া (গৌণ ক্রিয়া) প্রয়োজন ততটুকুই মাত্র প্রয়োগ করিয়া থাকে।

এই অখন্ডনীয় সত্যসমূহ—যাহা প্রকৃত জগতে ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে স্বতই আমাদের চোখে পড়ে—-একদিকে যেমন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার উপকারিতা আমাদের নিকট প্রমাণ করেছে, তেমনি অপরদিকে বিরুদ্ধ ক্রিয়াশীল ঔষধ প্রয়োগে অ্যান্টিপ্যাথিক ও উপশমকারী চিকিৎসার ফল ঘোষণা করিতেছে ।

হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য বিধানে অভিজ্ঞতা আমাদিগকে এই শিক্ষা দেয় যে, লক্ষণের সাদৃশ্যহেতু জীবনীশক্তির ক্ষেত্র হইতে সদৃশ প্রাকৃতিক ব্যাধিকে পরাভূত ও দূরীভূত করিতে এই পদ্ধতিতে ব্যবহৃত ওষুধের অসাধারণ ক্ষুদ্র মাত্রায় যথেষ্ট। ব্যাধি বিনষ্ট হওয়ার পরে দেহের ভিতরে প্রথমে ঔষধজনিত পীড়া কিছু পরিমাণে অবশিষ্ট থাকে বটে কিন্তু ওষুধের অত্যন্ত স্বল্প মাত্রা প্রয়োগহেতু সেই পীড়া এত ক্ষণস্থায়ী, এত তুচ্ছ এবং তাহা আপনি এত শীঘ্র মিলাইয়া যায় যে স্বাস্থ্য পুনরানয়নের জন্য যতটুকু যথেষ্ট তাহার বেশি প্রতিক্রিয়া এই নগন্য কৃত্রিম পীড়ার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করিবার প্রয়োজন হয় না অর্থাৎ সেটুকু প্রতিক্রিয়া যেটুকু সম্পূর্ণ আরোগ্যবিধানের পক্ষে যথেষ্ট, এবং পূর্বেকার ব্যাধি দূরীভূত হওয়ার পরে তাহা অল্পই প্রয়োজন হয় ।

অ্যান্টিপ্যাথিক (ক্ষণিক উপশমদায়ী) চিকিৎসাপদ্ধতিতে কিন্তু ঠিক ইহার বিপরীত ঘটে। চিকিৎসক কর্তৃক রোগলক্ষণের বিরুদ্ধে ঔষধলক্ষণের প্রয়োগকে (যেমন তীব্র বেদনায় আফিমের মুখ্য ক্রিয়ার ফলে অসাড়তা ও বোধশক্তিহীনতা) একেবারে সম্বন্ধবিহীন কিংবা সম্পূর্ণ বিভিন্ন জাতীয় সম্বন্ধেবিশিষ্ট বলা যায় না । রোগলক্ষণের সহিত ঔষধ লক্ষণ স্পষ্টই একটা সম্বন্ধ সূত্রে আবদ্ধ, কিন্তু যাহা হওয়া উচিত ইহা তাঁহার বিপরীত । এই প্রণালীতে ইহাই অভিপ্রেত যে ঔষুধের বিপরীত লক্ষণদ্বারা রোগলক্ষণ বিনষ্ট হইবে, কিন্তু তাহা কখনই সম্ভবপর নহে । তবে ইহা নিঃসন্দেহে যে, সদৃশ ব্যাধি সৃষ্টি করে বলিয়া হোমিওপ্যাথিক ঔষধ রোগের যে স্থানে গিয়ে লাগে, বিপরীত পদ্ধতি মতে নির্বাচিত ঔষধ ও ঠিক সেই স্থানে গিয়ে স্পর্শ করে। কিন্তু শেষোক্ত পদ্ধতিতে ঔষধ লক্ষণ হালকাভাবে রোগের বিপরীত লক্ষণের নিকট পৌঁছিয়া তাহাকে জীবনীশক্তির অনুভূতির ক্ষেত্র হইতে কেবল কিছুক্ষণের জন্য সরাইয়া দেয়। সেজন্য বিপরীতধর্মী উপশমদায়ক ঔষুধের ক্রিয়ার প্রথম ভাগে জীবনীশক্তি ঔষধ কিংবা পীড়া এই উভয়ের কোনটির দরুন অস্বস্তিবোধ করে না, মনে হয় যেন তারা পরস্পরকে সূক্ষ্মভাবে প্রশমিত করিয়া ফেলিয়াছে (যেমন, যন্ত্রণার ক্ষেত্রে অসাড়তা উৎপাদক আফিমের ক্রিয়া)। প্রথম কয়েক মুহূর্ত জীবনীশক্তি বেশ সুস্থ অনুভব করে, আফিমের অবসাদ কিংবা ব্যাধির যন্ত্রণা কিছুই অনুভব করে না। কিন্তু বিপরীতধর্মী ঔষধের লক্ষণ (হোমিওপ্যাথির মতে ) জীবনীশক্তির অনুভূতির দিক দিয়া সদৃশ অথচ বলবত্তর কৃত্রিম ব্যাধির মতো দেহের পীড়িত স্থানটিকে অধিকার করিতে পারে না এবং সেইজন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মত সদৃশ কৃত্রিম ব্যাধি সৃষ্টি করিয়া জীবনীশক্তিকে এরূপভাবে আক্রমণ করতে পারে না যাহাতে তাহা ঠিক প্রাকৃতিক ব্যাধির স্থানটিতে গিয়া প্রবেশলাভ করিতে পারে। ক্ষণিক উপশমদায়ী ঔষধ ব্যাধি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং তাহার বিপরীত বলিয়া ব্যাধিকে নির্মূল করিতে অক্ষম। যেমন পূর্বে বলা হইয়াছে সূক্ষ্মভাবে পরস্পরের প্রশমন ঘটিয়াছে এইরূপ প্রতীয়মান হওয়ায় প্রথমে জীবনীশক্তি কিছুই অনুভব করিতে পারেনা, কিন্তু প্রত্যেকটি ঔষধিজাত ব্যাধির মতো ইহাও ( এন্টিপ্যাথিক ঔষধ ) আপনাআপনি অন্তর্হিত হইয়া গেলে পড়িয়া থাকে শুধু ব্যাধি- যেমন পূর্বে ছিল। শুধু তাহাই নহে, ও ঔষধ ( যেমন অন্যান্য উপশম দায়ী ঔষধ রোগ সারাবার জন্য বৃহৎ মাত্রায় দেওয়া হয়) তাহার বিপরীত অবস্থা আনয়নের জন্য ( ৬৩,৬৪ সূত্র) জীবনীশক্তিকে বাধ্য করে অর্থাৎ সেই অবস্থা ঔষুধের ক্রিয়ার বিপরীত এবং সেইজন্য তাহা তখনও বিদ্যমান অবিনষ্ট প্রাকৃতিক পীড়ার অনুরূপ। জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়ার ফলে শেষোক্ত পীড়ার সহিত তাহা যুক্ত হইয়া স্বভাবতই পীড়াকে আরো বাড়াইয়া শক্তিশালী করিয়া তোলে। ক্ষণিক উপশমের কাল কাটিয়া গেলে রোগলক্ষণটি ( ব্যাধির একটি অংশ মাত্র) আনুষঙ্গিকভাবে আরো বাড়িয়া যায় এবং এই বৃদ্ধি উপশমদায়ী ঔষধের মাত্রার পরিমাণের অনুপাতে হয়। অতএব (পূর্বোক্ত দৃষ্টান্ত অনুসারে ) যন্ত্রণার উপশমের জন্য আফিমের মাত্রা যত বাড়ান হইবে আফিমের ক্রিয়া চলিয়া গেলেই সেই পরিমাণে পূর্বের যন্ত্রণাকে অতিক্রম করিয়া যন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে।

পূর্বে যাহা বলা হইয়াছে তাহা হইতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি যে, রোগ বলিতে চিকিৎসক যাহা কিছু বুঝেন এবং সেজন্য আরোগ্যবিধান প্রয়োজন তাহা রোগীর যন্ত্রণা এবং তাহার স্বাস্থ্যের বোধগম্য পরিবর্তনের মাধ্যমে, এককথায় লক্ষণসমষ্টির ভিতর দিয়া প্রকাশিত হয়। এই লক্ষণসমষ্টির দ্বারা রোগী রোগমুক্তির জন্য উপযুক্ত ঔষধের দাবি জানায়। অপরপক্ষে ইহাকে নির্দেশ করিয়া যাহা কিছু আভ্যন্তরীণ কারণ আরোপ করা হয়, যাহা কিছু রোগ উৎপাদনকারী দুর্জ্ঞেয় বস্তুর কল্পনা করা হয় তাহা অলীক স্বপ্ন ভিন্ন কিছুই নহে। এই যে দৈহিক অসুস্থতা যাহাকে আমরা ব্যাধি বলি ওষুধ প্রয়োগ দ্বারা তাহাকে কেবল আরেকটি আবর্তন এর ভিতর দিয়া স্বাস্থ্যে ফিরাইয়া আনা সম্ভব। সেই ওষুধের আরোগ্যদায়িনী শক্তি শুধু নির্ভর করে মানুষের স্বাস্থ্যের পরিবর্তন সাধন অর্থাৎ রোগলক্ষণ উৎপাদন করিবার বিশিষ্ট ক্ষমতার উপর এবং তাহা খুব স্পষ্ট ও বিশুদ্ধভাবে জানা যায় ঔষধসমূহের সুস্থ শরীরে পরীক্ষা করিয়া। সকল অভিজ্ঞতা ইহাই শিক্ষা দেয় যে কোন প্রাকৃতিক ব্যাধি কখনোই সেই ওষুধ দ্বারা নিরাময় হয় না, যাহা সুস্থ শরীরে পরীক্ষায় যে রোগ সারাতে হইবে তাহা হইতে ভিন্ন একটা বিসদৃশ রোগ উৎপন্ন করে (অতএব এলোপ্যাথি মতে কখনোই নহে )। এমনকি প্রাকৃত জগতেও এরূপ আরোগ্যবিধান কখনই দেখা যায় না যাহাতে কোন আভ্যন্তরীণ ব্যাধি অন্য একটি বিসদৃশ রোগ সংযোগে- তাহা যতই হোক না- দূরীভূত, বিনষ্ট এবং আরোগ্যপ্রাপ্ত হয়। বরং সকল অভিজ্ঞতা হইতে এই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সুস্থ দেহের উপর পরীক্ষার ফলে ঔষধের যেসকল লক্ষণ পাওয়া যায় তাহা রোগের বিপরীত একটিকেই উদ্দেশ্য করিয়া প্রয়োগ করা হলে দীর্ঘস্থায়ী রোগকে কখনো দূরীভূত করা যায় না। তাহাতে কেবল সাময়িক উপশম হয় মাত্র, কিন্তু পরে আবার রোগের বৃদ্ধি ঘটে। এক কথায় বলা যায়, এই প্রকার সাময়িক উপশমদায়ী এনটিবেটিক চিকিৎসা দীর্ঘস্থায়ী গুরুতর রোগের আরোগ্য বিধানে একেবারেই নিষ্ফল। অতএব, তৃতীয় এবং কেবলমাত্র অন্যতম সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতিকে (হোমিওপ্যাথিক)– যাহাতে কোন প্রাকৃতিক ব্যাধির লক্ষণসমষ্টিকে উদ্দেশ্য করিয়া সুস্থ দেহের উপর অনুরূপ লক্ষণ উৎপাদনকারী ঔষধ উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়- বলা যায় একমাত্র ফলদায়ক আরোগ্যপন্থা। তাহার দ্বারা জীবনীশক্তির পীড়াদায়ক সূক্ষ্ম শক্তিবিশিষ্ট ব্যাধিসমূহ সম্পূর্ণরূপে ও স্থায়ীভাবে নিঃশেষিত ও তিরোহিত হইয়া যায়। বলবত্তর সদৃশলক্ষণবিশিষ্ট হোমিওপ্যাথিক ওষুধই জীবনীশক্তির অনুভূতি ক্ষেত্রে এইরূপ ক্রিয়া আনয়ন করিতে সমর্থ। মুক্ত প্রকৃতির নিকট হইতে আমরা এই পদ্ধতির উদাহরণ পাইতে পারি যেমন, যখন একটি পুরাতন ব্যাধির সহিত একটি নতুন সদৃশ ব্যাধির সংযোগ ঘটে তখন নতুন ব্যাধিটি দ্রুত এবং চিরকালের জন্য বিনষ্ট হইয়া আরোগ্য প্রদান করেন।

এ বিষয়ে যখন কোন সন্দেহ নাই যে মানুষের পীড়া বলিতে কেবল কতগুলি লক্ষণকে বুঝায় এবং সেগুলিকে সদৃশ কৃত্রিম লক্ষণ উৎপাদনকারী ঔষধ এর সাহায্যে বিনষ্ট করিয়া স্বাস্থ্য ফিরাইয়া আনা যায় (প্রকৃত আরোগ্য বিধানের ইহাই পদ্ধতি), তখন আরোগ্যবিধান প্রণালীকে নিম্নলিখিত তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়- ১) আরোগ্য বিধান করিবার জন্য কি জানা আবশ্যক তাহা চিকিৎসক কি রূপে নির্ধারণ করিবেন? ২) প্রাকৃতিক ব্যাধিকে নিরাময় করিবার জন্য উপকরণসমূহের অর্থাৎ ঔষধের রোগ উৎপাদনকারী ক্ষমতা সম্বন্ধে কিভাবে জ্ঞানলাভ করা যায়? ৩) প্রাকৃতিক ব্যাধিসমূহকে দূর করিবার জন্য সেই সকল কৃত্রিম রোগ উৎপাদক বস্তুসমূহকে (ঔষধ) প্রয়োগ করিবার সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত পদ্ধতি কি?

অনুসন্ধানের প্রথম বিষয়টি সম্বন্ধে সাধারণভাবে নিম্নলিখিত প্রাথমিক আলোচনা করা যাইতেছে । মানুষ যেসব রোগে ভোগে সেইগুলি হয় অস্বাভাবিক বিশৃংখলাগ্রস্থ জীবনীশক্তির অসুস্থতাব্যঞ্জক দ্রুত প্রণালী- যাহার ভোগকাল কমবেশি অল্প সময়ের মধ্যে, কিন্তু সবসময়ই নিয়মিত সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার প্রবণতা দেখা যায় এবং সেই গুলিকে বলা হয় অচিররোগ অথবা সেগুলি এরূপ প্রকৃতির যে সামান্যভাবে ও প্রায় অজ্ঞাতসারে সূচনা লইয়া সূক্ষ্মভাবে দেহযন্ত্রকে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে পীড়িত করে এবং ক্রমশ সুস্থ অবস্থা হইতে তাহাকে এইরূপভাবে বিচ্যুত করে যে, স্বয়ংক্রিয় জীবনীশক্তি- যাহার কাজ হইল স্বাস্থ্য বজায় রাখা- কেবল প্রথম এবং বিকশিত অবস্থায় সেগুলিকে অসম্পূর্ণ ও অযোগ্যভাবে ব্যর্থ প্রতিরোধ দিলেও নিজের চেষ্টায় তাহাদের ধ্বংসসাধন করিতে অসমর্থ হয় এবং অসহায়ভাবে তাহাদিগকে বর্ধিত হইতে দিয়া নিজেকে- যতদিন মৃত্যু না ঘটে- অধিকতর পীড়িত হইতে দিতে বাধ্য হয়। এই সকল পীড়াকে বলা হয় চিররোগ। তাহাদের উৎপত্তি ঘটে কোন চিররোগবীজের সূক্ষ্ম সংক্রমণ দ্বারা।

অচিররোগসমূহ সম্বন্ধে বলা যায়, উহাএই ধরনের যে ব্যক্তিগতভাবে তাহা মানব কে আক্রমণ করে এবং তাহাদের উদ্দীপক কারণসমূহ হইল পারিপার্শ্বিক ক্ষতিকর প্রভাব। অতিভোজন কিংবা অতিস্বল্পাহার দেহের উপর যথেচ্ছাচার, ঠান্ডা লাগান, অত্যাধিক গরম লাগান, অসংযম, শুরু পরিশ্রম প্রভৃতি কিংবা দৈহিক উত্তেজনা, মানসিক উদ্বেগ বা ঐ প্রকার কোনকিছু অচির জ্বররোগসমূহের উদ্দীপক কারণ। বাস্তবিকপক্ষে সেইগুলি কেবল অন্তর্নিহিত সোরার সাময়িক স্ফুরণ ছাড়া আর কিছুই নহে। সেই এচিররোগগুলিয়খুব ভীষণ প্রকৃতির না হইলে এবং সেই গুলিকে শীঘ্র দমন করা গেলে সোরা আবার তাহার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে যায় । অথবা সেইগুলি (অচিররোগসমূহ) এইরূপ ধরনের যে কতকগুলি লোক আবহাওয়া অথবা পার্থিব কারনে ক্ষতিকর বস্তুসমূহ দ্বারা একই সময়ে এখানে সেখানে (বিক্ষিপ্তভাবে) আক্রান্ত হয় । সেগুলির দ্বারা পীড়িত হইবার প্রবণতা এককালে অল্প কয়েকটি লোকের মধ্যে দেখা যায় । এই প্রকার সমজাতীয় আরও কতকগুলি ব্যাধি আছে যাহাদের দ্বারা একই কারণে এবং ঠিক অনুরূপ পীড়ায় অনেক লোক আক্রান্ত হইয়া থাকে (মহামারীরূপে) । এই সকল ব্যাধি ঘনবসতিযুক্ত স্থানে দেখা দিলে সাধারণত তাহা সংক্রামকরূপ ধারণ করে। তাহার ফলে প্রত্যেক ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটে এবং একই কারণ হইতে উদ্ভূত বলিয়া সকল পীড়িত ব্যক্তির একই প্রকার উপসর্গ আনয়ন করে এবং অচিকিৎসিত অবস্থায় থাকিলে একটা নিয়মিত সময়ের মধ্যে হয় রোগীর মৃত্যু ঘটে নতুবা রোগ সরিয়া যায় । যুদ্ধ, জলপ্লাবন ও দুর্ভিক্ষ প্রভৃতি সঙ্কট প্রায়ই তাহাদের উদ্দীপক কারণ এবং উৎপাদনের হেতু। কখনও কখনও সেইগুলি এক বিশেষ ধরনের অচির রোগবীজ যাহা একইভাবে বারবার ফিরে আসে (সেই জন্য বিশেষ পরিচিতি কোন নামে খ্যাত) । তদ্দ্বারা জীবনে একবার মাত্র আক্রান্ত হয়, যেমন বসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, সিডেনহামের পুরাতন মসৃণ রক্তবর্ণ স্কর্লেটজ্বর মাম্পস প্রভৃতি ।

হায়! চিররোগসমূহের মধ্যে এমন কতকগুলি রোগকে গণ্য করিতে হয় যেগুলি সাধারণত দেখা যায় এবং যেগুলি দীর্ঘকাল ধরিয়া এলোপ্যাথিক চিকিৎসার অধিক ও অধিকতর মাত্রায় প্রচন্ড ঔষধসকল ব্যবহারের ফলে উৎপন্ন হয়। ক্যালোমেল, করোসিভ সাবলিমেট, পারদঘটিত মলম, সিলভার নাইট্রেট, আয়োডিন এবং তাহার মলম, আফিম, ভ্যালেরিয়ান, সিঙ্কোনা ছাল এবং কুইনিন, ফক্সগ্লোভ, প্রুসিক অ্যাসিড, সালফার ও সালফিউরিক অ্যাসিড, নিত্য ব্যবহৃত বিরেচকসমূহ, শিরাকর্তন, রক্তমোক্ষণ, জোক লাগান, কৃত্তিম ক্ষত প্রভৃতি কুফলে ঐ প্রকার রোগের উৎপত্তি ঘটে এবং যার দ্বারা জীবনীশক্তিকে কখনও কখনও নির্দয়ভাবে বলহীন করা হইয়া থাকে এবং ইহা একেবারে অভিভূত না হইলে এরূপভাবে পীড়িত হইয়া পড়ে (প্রত্যেকটি পদার্থের বৈশিষ্ট্য অনুসারে) যে, ঐ সকল বিরুদ্ধ ও হানিকর আক্রমণ হইতে বাচার জন্য দেহাভ্যন্তরে অবশ্যই একটি বিদ্রোহের সৃষ্টি করে এবং হয়না কোন অংশ হইতে উত্তেজনা ও অনুভবশক্তি হরণ করে বা অতিমাত্রায় তাহা বর্ধিত করে, কোন অংশকে প্রসারিত বা সংকুচিত করে, শিথিল বা শক্ত করে, এমনকি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ও বাহিরে বা ভিতরে ত্রুটিপূর্ণ যান্ত্রিক পরিবর্তন আসে (দেহের বাহির ও ভিতর অকর্মণ্য করিয়া দেয়); আর তাহা করে ঐ সকল ধ্বংসাত্বক শক্তির নিত্য নব বিরুদ্ধ আক্রমণ দ্বারা সম্পূর্ণ বিনাশের কবল হইতে জীবনকে রক্ষা করিবার জন্য।

অ্যালোপ্যাথির অনারোগ্যদায়ক প্রথায় (বিশেষ করে বর্তমান সময়ে) মানুষের স্বাস্থ্যের উপরে এইরূপ ক্রমাগত আক্রমণ সকল প্রকার রোগের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শোচনীয় ও অসাধ্য। দুঃখের সহিত আমি আরও বলি যে, তাহাদের খুব বাড়াবাড়ি অবস্থায় আরোগ্যবিধানকল্পে কোন ঔষধ নির্ধারণ বা নির্বাচন করা স্পষ্টত অসম্ভব।

কিন্তু মানুষ্যদেহের বাহিরে ও ভিতরে বৎসরের পর বৎসর অবিরাম-ভাবে ঐ সকল ক্ষতিকর ঔষধ দিয়ে চিকিৎসার দ্বারা যে ধ্বংস ও বিকৃতি সাধিত হয় তাহার সহিত প্রতিকার জীবনে শক্তিকেই করিতে হইবে (ভিতরে যদি কোন চিররোগবীজ লুকাইয়া থাকে তাহা নির্মূল করবার জন্য যথোপযুক্ত সাহায্য দেওয়া প্রয়োজন) ইহা সম্ভব, যদি জীবনীশক্তি ঐরূপ ক্ষতিকর ক্রিয়ার পূর্ব হইতেই অত্যাধিক দুর্বল হইয়া না পড়িয়া থাকে এবং কতিপয় বৎসর অবাধে এই বৃহৎ কার্যকরী বার অবসর পায়। অনারোগ্য দায়ক এলোপ্যাথিক চিকিৎসা হইতে প্রায়শ উৎপন্ন ঐসকল অসংখ্য

অনিষ্টকর মদ্যাদি বা খাদ্যে আসক্ত হইয়া, স্বাস্থ্যনাশকারী বিভিন্ন প্রকার অসংযত আচরণের লিপ্ত হইয়া, জীবনধারণের প্রয়োজনীয় বস্তু সমূহ হইতে সুদীর্ঘকাল বঞ্চিত থাকিয়া, অস্বাস্থ্যকর স্থানে বিশেষত জলাজমিতে, গুহা বা আবদ্ধ গৃহে বাস করিয়া, ব্যায়াম ও মুক্তবাতাস বর্জন করিয়া, শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রমের স্বাস্থ্য নষ্ট করিয়া, সর্বদা মানসিক দুশ্চিন্তায় কাটাইয়া এই প্রকার ব্যাধি উৎপন্ন হয়। যদি কোন চিররোগবীজ দেহের ভিতর লুকাইয়া না থাকে তাহা হইলে এই প্রকার স্বকৃত অসুস্থ অবস্থা, উন্নততর জীবনযাপন আরম্ভ করিলে, আপনাআপনি দূরীভূত হয় ও তজ্জন্য সেগুলিকে চিররোগ বলা যায় না।

যথার্থ প্রাকৃতিক চিররোগ সেই গুলিকে বলা হয় যাহা কোন চিররোগবীজ হইতে উৎপন্ন এবং যাহা যথোপযুক্ত ঔষধ দিয়া না সরাইলে দৈহিক ও মানসিক সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা সত্ত্বেও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে থাকে এবং ক্রমাবনতির পথে চলে অধিকতর যন্ত্রণা দিয়া রোগীকে সারাজীবন কষ্ট দেয়। কচি কিৎসা হইতে উৎপন্ন পীড়াসমূহ (৭৪ সূত্র) বাদ দিলে এইগুলি সর্বাপেক্ষা অধিক ও মনুষ্যজাতির সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু। কেননা, বলিষ্ঠ দেহ, নিয়মনিষ্ঠ জীবনযাপন ও জীবনীশক্তির সতেজ ক্রিয়াশীলতা তাহাদিগকে নির্মূল করতে অক্ষম।

এখন পর্যন্ত সিফিলিসকেই কিছুটা চিররোগবীজোৎপন্ন বলিয়া ধরা হইয়াছে, যাহা অচিকিৎসা অবস্থায় থাকলে জীবনের সমাপ্তির সঙ্গে শেষ হয়। অর্বুদযুক্ত সাইকোসিস ( প্রমেহ) ঠিক একইভাবে উপযুক্ত ঔষধ দ্বারা চিকিৎসা ব্যতীত যাহাকে নির্মূল করা যায় না—-নিঃসন্দেহে চিররোগবীজজাত একটি বিশিষ্ট ব্যাধি হইলেও তাহা স্বীকৃত হয় নাই। চিকিৎসকগণ চর্মের উপরকার উদ্ভিদগুলি নষ্ট করিয়াই মনে করিতেন যে তাহারা আরোগ্যদান করিয়াছেন, কিন্তু রোগজনিত ঋতুদোষের একগুঁয়েমিতা তাহাদের দৃষ্টি এড়াইয়া যাইত।

এইমাত্র যে দুইটি চিররোগবীজের কথা বলা হইল তাহা অপেক্ষা চিররোগে সোরাবীজের প্রাধান্য ও গুরুত্ব সহস্রগুণ বেশি। পূর্বোক্ত দুইটি তাহাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুসারে ধাতুদোষ প্রকাশ করে, একটি যৌনক্ষত দ্বারা, অন্যটি ফুলকপির ন্যায় অর্বুদ উৎপন্ন করিয়া। সোরাবীজও সমগ্র দেহে সংক্রামিত হওয়ার পরে এক প্রকার বিশেষ চর্মোদ্ভেদের ভিতর দিয়া আত্মপ্রকাশ করে। কখনও সেগুলি ফোস্কাজাতীয় এবং তাহার সঙ্গে থাকে আরামদায়ক সুড়সুড়িযুক্ত অসহ্য চুলকানি (এবং একপ্রকার বিশেষ গন্ধ )। এই ভয়ঙ্কর অভ্যন্তরীণ চিররোগবীজ সোরা বিভিন্ন প্রকার অগণিত পীড়ার একমাত্র প্রকৃত মূলকারণ এবং জনক। এই সকল রূপ রীতি সম্মত নিদানশাস্ত্রসমূহে স্নায়ুদৌর্বল্য, হিস্টিরিয়া, চিত্তোন্মাদ, পাগলামি, বিষণ্নতা, জড়বুদ্ধি, মৃগী ও নানাবিধ তড়কা, র্যাকাইটিস, মেরুদন্ড সংক্রান্ত রোগ, অস্থিক্ষত, ক্যান্সার, গেঁটেবাত, অর্শ, ন্যাবা, নীলরোগ , শোথ, রজঃরোধ, পাকস্থলী নাসিকা ফুসফুস মূত্রাশয় ও জরায়ু হইতে রক্তস্রাব, হাঁপানি, ফুসফুসের ক্ষত, ধ্বজভঙ্গ ও বন্ধ্যাত্ব, আধকপালে, বধিরতা, ছানি অন্ধতা, মূত্রপাথরি, পক্ষাঘাত, ইন্দ্রিয়াদির অকর্মণ্যতা এবং সহস্র প্রকারের ব্যথা-বেদনা প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ স্বতন্ত্র রোগরূপে পরিচয় পাইয়াছে।

শতশত বংশপরস্পরায়, লক্ষলক্ষ মানবদেহের ভিতর দিয়া সঞ্চালিত হইয়া অতি প্রাচীন এই সংক্রামক রোগের এইভাবে বিশ্বাসাতীত বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আমাদিগকে বুঝাইয়া দেয় মানুষ্য পরিবারের এখন তাহা কত অসংখ্য প্রকারের পীড়া সৃষ্টি করিয়াছেন; বিশেষত যখন আমরা চিন্তা করি, বংশগত ধাতুপ্রকৃতি সংবলিত মানবগোষ্ঠীর বর্ণনাতীত বৈচিত্র ছাড়াও কত বিভিন্ন অবস্থা এই প্রকার নানা চিররোগসমূহ ( সোরার গৌণ লক্ষণসমূহ) সৃষ্টি করার জন্য দায়ী। সুতরাং এইরূপ ক্ষতিকর বিভিন্ন কারণসমূহ সোরাবীজাক্রান্ত বিভিন্ন মানবদেহের উপর প্রকাশ করিয়া যদি অসংখ্য প্রকারের বিকৃতি, ক্ষতি, বিশৃংখলা ও যন্ত্রণা লইয়া আসে তাহা হইলে বিষ্মেয়ের কিছু নাই। পুরাতন নিদান গ্রন্থসমূহে এই সকলকে এযাবৎকাল বিশেষ বিশেষ নাম দিয়া প্রত্যেকটিকে স্বতন্ত্র ব্যাধি বলিয়া ধরা হয়েছে।

যদিও চিররোগসমূহের প্রধান উৎপত্তিস্থল নির্ণয় এবং সোরার চিকিৎসার জন্য অমোঘ হোমিওপ্যাথিক ঔষধসমুহ আবিষ্কারের সঙ্গে চিকিৎসা প্রণালী, চিকিৎসিতব্য অধিকাংশ রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞানের সীমানার মধ্যে আসিয়া পৌঁছিয়াছে তবুও প্রত্যেকটি চিররোগে ( সোরাজাত ) আরোগ্যদান করিবার জন্য ঔষধ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে লক্ষণ ও বিশেষত্বগুলি সাবধানে সংগ্রহ করার কাজ উক্ত আবিষ্কারের পূর্বের ন্যায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের পক্ষে এখনো অপরিহার্য। কারণ, এই রোগ কিংবা অন্য রোগের প্রকৃত আরোগ্যবিধান যথানিয়মে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যক্তিগত বিশেষত্ব নির্ণায়ক চিকিৎসা ব্যতীত সম্ভব হয়না। এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে- রোগ কখনো অচির ও দ্রুতগতিতে বাড়িয়া উঠে এবং কখনো তাহা ধীর গতিতে চলিতে থাকে (চির)- এই পার্থক্য নির্ণয় করিতে হইবে। এরূপ দেখা যায় যে, অচির রোগে প্রধান লক্ষণসমূহ অপেক্ষাকৃত দ্রুত আমাদের কাছে ধরা দেয় এবং আমাদের অনুভবে আসে, সেইজন্য রোগের চিত্র অঙ্কন করিতে অপেক্ষাকৃত কম সময় লাগে এবং সেইজন্য কয়েকটি অল্প প্রশ্ন করিলেই চলে কারণ সবটাই আপনা হইতেই প্রকাশমান । সেই তুলনায় চিররোগ কয়েক বৎসর ধরিয়া ক্রমবর্ধমানভাবে চলিতে থাকে বলিয়া লক্ষণসমূহ সংগ্রহ করা অধিকতর কষ্টসাধ্য।

প্রত্যেকটি রোগীকে ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা করিবার উদ্দেশ্যে এখানে আমি সাধারণ নির্দেশ দেব এবং তাহার প্রত্যেকটির সম্বন্ধে যাহা প্রাসঙ্গিক তাহাই মাত্র চিকিৎসকের স্বরণ রাখিতে হইবে। এইরূপ পরীক্ষাকার্যে চিকিৎসকের পক্ষে যাহা প্রয়োজন তাহা হইল পূর্বসংস্কার হইতে মুক্তি, ইন্দ্রিয় শক্তির অটুট কর্মপটুতা, মনোযোগের সহিত পর্যবেক্ষন এবং রোগচিত্র অংকনে বিশ্বস্ততা।

রোগী তাহার পীড়ার ইতিহাস বর্ণনা করিবে, রোগীর কষ্ট সম্বন্ধে যাহা কিছু শুনিয়াছে তাহা রোগীর পরিচর্যাকারীগণ বলিবে, রোগী কিরূপ আচরণ করে এবং তাহারাই বা কি লক্ষ্য করিয়াছে তাহারা তাহাও বলিবে। চিকিৎসক নিজে দেখিবেন, শুনিবেন এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় সাহায্যে রোগীর ভিতরে কোন পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক যাহা কিছু আছে তাহা লক্ষ্য করিবেন। রোগী এবং তাহার বন্ধুগণ যেভাবে বলেন ঠিক সেইভাবে চিকিৎসক সেসকল লিখিয়া লইবেন। তিনি নিজে চুপ করিয়া থাকিয়া তাহাদের যাহা কিছু বলিবার আছে বলিতে দিবেন এবং বক্তব্য অন্য প্রসঙ্গে চলিয়া না গেলে কোনোরূপ বাঁধাই দেবেন না। যাহাতে বক্তাগনের বক্তব্যের প্রয়োজনীয় অংশগুলির লিখিয়া লইতে পারেন সেজন্য রোগীলিপি প্রস্তুত করিবার প্রারম্ভে ধীরে ধীরে বলিবার জন্য তিনি তাঁহাদিগকে উপদেশ দিবেন।

রোগী কিংবা তাঁহার বন্ধুগণ কথিত প্রত্যেকটি নূতন ঘটনা নূতন অনুচ্ছেদে লিখিতে আরম্ভ করিবেন। ইহাতে লক্ষণগুলি শ্রেণীবদ্ধভাবে একটির নিচে আর একটি আলাদা আলাদাভাবে সাজানো হইবে এবং প্রথমে অস্পষ্ট রূপে কিছু বলা হইয়া থাকিলে ও পরে তাহা আরও পূর্ণাঙ্গ করিয়া বলা হইলে তিনি সেইটির সহিত যোগ করিয়া লইবার সুবিধা পাইবেন।

বর্ণনাকারীর স্বতঃস্ফূর্ত বক্তব্য শেষ হওবার পর চিকিৎসক প্রত্যেকটি বিশেষ লক্ষণের দিকে নজর দিবেন এবং সেই সম্বন্ধে আরও সঠিক বিবরণ জানিবার জন্য তাহাকে যেভাবে বলা হইয়াছে সেই ভাবে একটির পর একটি লক্ষণ পড়িয়া শুনাইবেন এবং প্রত্যেকটি সম্বন্ধে আরও বিশেষ তথ্য জানিবার জন্য প্রশ্ন করবেন; যেমন কোন সময়ে এই লক্ষণটি দেখা গিয়েছিল? রোগী এখন যে ঔষধ খাইতেছে তাহার পূর্বে কি এই লক্ষণ ছিল না? ঔষধ ব্যাবহারকালীন ইহা দেখা দিয়েছিল? অথবা ঔষধ বন্ধ করিবার কয়েকদিন পর দেখা দিয়েছে? কি ধরনের বেদনা, ঠিক কেমন বোধ হয়, তাহা কি এই স্থানেই হইয়াছিল? ঠিক কোন জায়গায় হইয়াছিল? যন্ত্রণায় কি আপনা আপনি যখন তখন হইত, না বিভিন্ন সময়ে? যন্ত্রণা কি সদা সর্বদা লাগিয়ে থাকিত? কতক্ষণ তাহা থাকিত?দিবারাত্রির কোন সময়ে এবং দেহের কি প্রকার অবস্থানে তাহা বাড়িত কিংবা সম্পূর্ণ কমিয়া যাইত? সাদা কথায় বলিতে গেলে বর্ণিত বিষয়ের সঠিক প্রকৃতি কিরূপ ছিল?

এইরূপে চিকিৎসক প্রতিটি বৃত্তান্ত সঠিক জানতে পারেন কিন্তু তিনি মনে এমন কোন প্রশ্ন করিবেন না যাহা হইতে রোগী হ্যাঁ কিংবা না বলিয়া উত্তর দিবার কোন ইঙ্গিত পায়। তাহা হইলে রোগী আলস্য বা বিভ্রান্তিবশত কিংবা প্রশ্নকর্তাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য হাঁ কিংবা না বলিয়া অসত্য অর্ধসত্য কিংবা ঠিক সত্য নহে এমন কিছু বলিতে প্রবৃত্ত হইবেন। ইহাতে রোগের একটা মিথ্যা চিত্র অঙ্কিত ও অনুপযোগী চিকিৎসা হইবে ।

এই সকল স্বেচ্ছাকৃত বর্ণনায় যদি দেহের ক্রিয়াগত কিংবা মানসিক কোন তথ্য বাদ পড়িয়া যায় তাহা হইলে সেই অংশ ও তাহার ক্রিয়া কিংবা মানসিক অবস্থা সম্বন্ধে আর কি বলার আছে তাহা চিকিৎসক জানিয়ে লইবেন। কিন্তু ইহা জানিয়া লইবার সময়ে তাহার প্রশ্ন হইবে সাধারণ ধরনের যাহাতে বর্ণনাকারী সে সম্বন্ধে বিশেষ বিবরণ দিতে বাধ্য হয়।

সূত্রঃ ৮৯। যখন রোগী (ভান করা রোগের ক্ষেত্র ছাড়া অনুভূতির বিবরণের জন্য প্রধানত তাহারই উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতে হয়) স্বতঃস্ফূর্ত বিবরণের মাধ্যমে এবং প্রশ্নের উত্তরে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করিয়া রোগের প্রায় যথাযথ একটা চিত্র অঙ্কিত করিয়াছে তখন চিকিৎসক ইচ্ছা করিলে এবং প্রয়োজন বোধ করলে (যদি তিনি মনে করেন যে তাহার প্রয়োজনীয় সকল তথ্য তখন ও পাওয়া যায় নাই ) আরও সঠিক, আর ও বিশেষ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে পারেন।

এই সকল বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে চিকিৎসকের লেখা শেষ হইলে তিনি তখন নিজে রোগী সম্বন্ধে কি পর্যবেক্ষণ করেন তাহা লিপিবদ্ধ করিবেন এবং তাহার কতখানি রোগীর সুস্থ অবস্থায় ছিল তাহা নিরূপণ করবেন ।

পূর্বের ঔষধ ব্যবহারের সময় যে সকল লক্ষণ ও অনুভূতি প্রকাশ পাইয়াছিল তাহা হইতে রোগের প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। অপরপক্ষে যে সকল লক্ষণ ও যন্ত্রণা ঔষধ ব্যাবহারের পূর্বে বা কিছুদিন ঔষধ ব্যবহার বন্ধ করিবার পরে দেখা গিয়েছিল তাহা হইতে রোগের আসল প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যায়। এইগুলি চিকিৎসক বিশেষ করিয়া লিখিয়া লইবেন। রোগটি যদি চিররোগ জাতীয় হয় এবং চিকিৎসকের কাছে আসা পর্যন্ত রোগী যদি ঔষধ নয় এমন কিছু দিয়া কিছুদিন রাখিয়া তাহার পরে আরো সঠিকভাবে রোগ লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার সুবিধা জনক। তাহা হইলে, পুরাতন রোগের অবিমিশ্র স্থায়ী লক্ষণগুলি বিশুদ্ধ ভাবে বুঝা যাইবে এবং তদ্বারা রোগের যথার্থ চিত্র পাওয়া সম্ভব হইবে।

কিন্তু রোগ যদি দ্রুত গতিতে বাড়িয়ে চলে এবং তাহার গুরুতর অবস্থার জন্য বিলম্ব করা নাচলে তাহা হইলে ঔষধ ব্যাবহারের পূর্বে কি লক্ষণ ছিল জানা সম্ভব না হইলেও ঔষধ জনিত রোগের বিকৃতি চিত্র লইয়াই চিকিৎসককে সন্তুষ্ট থাকিতে হইবে। ইহা হইতে তিনি অত্যন্ত তখনকার মত রুপ চিত্র সম্বন্ধে একটা সমগ্র ধারণা করিয়া লইতে পারবেন অর্থাৎ ওষুধজ ও মূল রোগের মিশ্রিত একটি চিত্র, যাহা অনুপোযোগী ঔষধ ব্যবহারের ফলে উদ্ভূত এবং মূলরোগ হইতে অধিকতর গুরুত্ব ও সাংঘাতিক এবং সেইজন্য যাহার দ্রুত ও কার্যকরী সাহায্যের প্রয়োজন। এইরূপে তিনি সম্পূর্ণ চিত্র অংকন করিয়া সুনির্বাচিত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দ্বারা ইহার প্রতিকার সাধনে সামর্থ্য হল। তাহার ফলে রোগী যে সকল ক্ষতিকর ঔষধ গলাধঃকরণ করিয়াছে তাহার কবলে তাহাকে আত্মসমর্পণ করতে হয় না।.

যদি অল্প দিনে কিংবা চিররোগের ক্ষেত্রে বহুকাল পূর্ব হইতে কোন সুনিশ্চিত কারণে রোগের আবির্ভাব ঘটিয়া থাকে তাহা হইলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিংবা সাবধানে প্রশ্ন করা হইলে তাহার উত্তরে তাহারা সে কথা উল্লেখ করিবে ।.

চিররোগসমূহের অবস্থাবিষয়ে অনুসন্ধান করার সময়ে রোগীর সাধারণ কাজকর্ম, তাহার স্বাভাবিক বসবাস ও খাদ্য , পারিবারিক অবস্থা সম্বন্ধে বিশেষ তথ্য ভালরূপে বিবেচনা করা ও তন্ন তন্ন করিয়া দেখা কর্তব্য। তদ্দ্বারা সেগুলির মধ্যে রোগের কি উৎপাদক বা পরিপোষক কারণ আছে জানা যাইবে এবং তাহা হইলে সেগুলির দূরীকরণ দ্বারা আরোগ্যের পথ সুগম হইবে।

চিররোগ সম্বন্ধে উল্লেখিত লক্ষণসমূহ ও অন্যান্য বিষয় যতদূর সম্ভব যত্নসহকারে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে অনুধাবন করিতে হইবে এবং সূক্ষ্মতম বৈশিষ্ট্য গুলি লক্ষ্য করিতে হইবে। কেননা, সেইগুলো অচিররোগে না মিলিলেও সেই সকল পীড়ায় সর্বাধিক পরিচয় বহন করে এবং রোগনিরাময়ের পক্ষে সেগুলির আর প্রয়োজন নাই বলিয়া ছাড়িয়া দেওয়া কর্তব্য নহে। আরো কারণ হইল, দীর্ঘকাল ভুগিতে ভুগিতে রোগী এইরূপ অভ্যস্ত হইয়া পড়ে যে ছোটখাট আনুষঙ্গিক লক্ষণ তাহার গাসহ্য হইয়া যায়, অথচ সেগুলি অত্যন্ত মূল্যবান এবং ঔষধ নির্বাচনের পক্ষে প্রায়ই অত্যাবশ্যক। স্বাস্থ্যের মতো সেগুলিকেও রোগী তাহার অবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলিয়া ধরিয়া লয়, সেগুলির প্রকৃত অনুভূতি রোগী পনের কিংবা কুড়ি বছর ব্যাপী রোগ ভোগে ভুলিয়া যায়। রোগী বিশ্বাস করিতে পারেনা যে মূল ব্যাধির সহিত এই সকল আনুষঙ্গিক লক্ষণের এই সকল অধিক বা অল্প স্বাস্থ্যবিচ্যুতির কোন যোগ থাকিতে পারে।.

ইহা ছাড়া, রোগীদের প্রকৃতিতে এত পার্থক্য থাকে যে, কেহ কেহ বিশেষত তথাকথিত বিষাদগ্রস্ত, অত্যন্ত অসহিষ্ণুত এবং অধিক যন্ত্রণাকাতর রোগীরা নিজেদের লক্ষণাবলী অতিরঞ্জিত করিয়া বলে যাহাতে চিকিৎসক সেইসকল কষ্টের আরোগ্যবিধানে সচেষ্ট হন।

অন্যেরা আবার ইহার বিপরীত চরিত্রের ।তাহারা হয়তো খানিকটা আলস্য, খানিকটা মিথ্যা বিনয় আর কিছুটা মৃদ প্রকৃতি বা মানসিক দুর্বলতার জন্য তাহাদের অনেক লক্ষণ ব্যক্ত করে না, অনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করে কিংবা কতকগুলিকে অনাবশ্যক বলিয়া নির্দেশ করে।

একদিকে রোগী তাহার রোগচিত্র তুলিয়া ধরিবার জন্য যে সকল যন্ত্রণা ও অনুভূতির কথা বর্ণনা করে তাহা মনোযোগের সহিত আমাদের যেমন শোনা উচিত ও তাহার বক্তব্যে বিশ্বাস করা উচিত– কেননা তাহার বন্ধু ও পরিচর্যাকারীরা সাধারণত তাহার পরিবর্তিতরূপে ও ভুলভাবে বর্ণনা করিয়া থাকে— তেমনি অপরদিকে সকল পীড়া, বিশেষত চিররোগের প্রকৃত ও সম্পূর্ণ চিত্র ও তাহার বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজন বিশেষ পর্যবেক্ষণ, কৌশল, মানবপ্রকৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান, অনুসন্ধান করার সময়ে সাবধানতা ও প্রচুর ধৈর্য।

মোটের উপর অচিররোগ কিংবা যে রোগ অল্পদিন হইয়াছে তাহার সম্বন্ধে অনুসন্ধান চিকিৎসকের কাছে সর্বাপেক্ষা সহজ কারণ, স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ও তাহার বিচ্যুতিসম্বন্ধীয় সকল ব্যাপার অল্পদিনের বলিয়া তখন ও রোগীর ও তাহার বন্ধুদের মনে তাহা টাটকা থাকে এবং তখনও তাহা কৌতূহল ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বলিয়া বোধ হয়। এই সকল ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের সবকিছু জানা অপরিহার্য হইলেও জিজ্ঞাসা করিতে হয় অনেক কম। স্বতঃপ্রবৃত্তভাবেই সব কথা তাহাকে বলা হয়।

মহামারী ও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রোগসমূহের লক্ষণ অনুসন্ধানকার্যে পৃথিবীতে সেই নামে কিংবা অন্য নামে আর কখনো সেইরূপ কিছু আসিয়াছে কিনা জানা সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন। সেই জাতীয় রোগের নতুনত্ব বা বৈশিষ্ট্য রোগপরীক্ষায় কিংবা চিকিৎসায় কোন পার্থক্য আনে না।

এইরূপ হওয়া স্বাভাবিক যে মহামারীর সময়ে প্রথম যে রোগীটি চিকিৎসকের নজরে আসে তাহাতে রোগের সমগ্র রূপ তখনই ধরা পড়ে না । কতকগুলি রোগীকে মনোযোগের সহিত পর্যবেক্ষণ করলে তবেই সমষ্টিগত সমগ্র লক্ষণের সহিত পরিচিত হওয়া যায়। অবশ্য গভীর মনোযোগী চিকিৎসক দুই একটি ক্ষেত্র প্রত্যক্ষ করিয়াও অনেক সময়ে প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে এরূপ জ্ঞান লাভ করিতে পারেন যে তাহার মনে একটা বিশিষ্ট চিত্র মুদ্রিত হইয়া যায় এবং তিনি সদৃশ লক্ষণযুক্ত একটি ঔষধ ও নির্বাচন করতে সমর্থ হন।

এই প্রকার রোগে বিভিন্ন রোগীর লক্ষণগুলি লিখিয়া লইতে লইতে রোগচিত্র সম্পূর্ণ হয়। তাহা শুধু সুদীর্ঘ কথাসর্বস্ব নহে, প্রকৃত পরিচয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং তাহাতে থাকে সমষ্টিগত রোগের অসাধারণ লক্ষণসমূহ। একদিকে যেমন তাতে সাধারণ লক্ষণ গুলি (যেমন, ক্ষুধাহীনতা, অনিদ্রা প্রভৃতি ) সম্বন্ধে বিশেষত্বপূর্ণ সঠিক বর্ণনা থাকে অপর দিকে তেমনি কতকগুলি বিশেষ লক্ষণ ও, যাহা সচরাচর দেখা যায় না এবং অল্প কয়েকটি রোগেই বিশেষভাবে পরিচিত (অন্তত একই সঙ্গে), পরিস্ফুট হইয়া উঠে এবং সেই রোগের চরিত্রগত লক্ষণ রূপে পরিগণিত হয়। কোন সময়ে কোন একটি মহামারী দ্বারা যাহারা আক্রান্ত হন তাহারা নিশ্চয়ই একই সূত্র হইতে সংক্রমিত হওয়ার ফলে একই পীড়ায় ভুগিয়া থাকেন । কিন্তু এইরূপ একটি মহামারীর সমগ্র প্রসার এবং তাহার লক্ষণসমষ্টি (যে পরিচয়লব্ধ জ্ঞান হইতে লক্ষণাবলীর জন্য সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন করা সম্ভব, সেই জ্ঞান রোগচিত্রের সমগ্র রূপ পর্যবেক্ষন দ্বারা পাওয়া যায়) একটি রোগীকে দেখিয়া জানা যায় না; তাহা বিভিন্ন ধাতু প্রকৃতিতে কতগুলি রোগীরা সমগ্রভাবে লক্ষ্য করিয়া জানা যায়।

সাধারণত অস্থায়ী প্রকৃতির মহামারী সম্বন্ধে যে কথা এখানে বলা হইল আদি রোগবীজজনিত রোগ সম্বন্ধে— যেগুলি (বিশেষত সোরা) মূলে একই থাকে বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে -তাহাদের লক্ষণসমূহ আরও বেশি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে হইবে। কারণ তাদের ক্ষেত্রেও একটি রোগীর মধ্যে আংশিক লক্ষণ পাওয়া যায়; দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং আরও অন্যান্য রোগীতে অন্য কতকগুলি লক্ষণ দেখা যায় এবং সেগুলি ও (বিশিষ্টভাবে) সমগ্র রোগের লক্ষণ সমষ্টির অংশ মাত্র। অতএব এইরূপ একটি চিররোগের বিশেষত সোরার লক্ষণবৈচিত্র পাওয়া সম্ভব কেবল ব্যক্তিগতভাবে অনেকগুলি চিররোগীকে পর্যবেক্ষণ করিয়া। এই প্রকার রোগ সমূহ কে সম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও তাদের সমষ্ঠিগত চিত্র ব্যতীত হোমিওপ্যাথি মতে সমগ্র ব্যাধিকে নিরাময় করিবার জন্য ঔষধ (যথা সোরাবিষঘ্ন) আবিষ্কার করা সম্ভব নহে । এইরূপ চিররোগাক্রান্ত অনেক রোগীর আবার এই সকল ওষুধই প্রকৃত মহৌষধ।

রোগের বিশিষ্ট পরিচালক লক্ষণাবলী অথবা অন্য কথায় যে প্রকার রোগই হউক না তাহার সঠিকভাবে চিত্রাঙ্কন একবার হইয়া গেলে কার্যের সর্বাপেক্ষা কঠিন অংশ শেষ হয়। চিকিৎসা পরিচালনার জন্য রোগের চিত্রটি, বিশেষত চিররোগ হইলে তাহা চিকিৎসকের সম্মুখে সর্বদা থাকে। তিনি তখন রোগের সকল দিক অনুসন্ধান করিয়া বিশেষ লক্ষণগুলি বাছিয়া লইতে পারেন এবং সমগ্র রোগকে প্রতিরোধ করিবার জন্য বিশুদ্ধভাবে পরীক্ষিত ভেষজভান্ডার হইতে হোমিওপ্যাথিক ঔষধরূপ একটি সদৃশ কৃত্রিম রোগশক্তিকে নির্বাচিত করিয়া প্রয়োগ করিতে পারেন। চিকিৎসা চলিতে থাকা কালে ঔষধ কতটা কাজ করিল এবং ঔষধ দ্বারা রোগীর অবস্থার কতটা পরিবর্তন ঘটিয়াছে যখন তিনি নির্ধারণ করিতে চাহেন তখন আবার প্রথম রোগী দেখিবার সময় যে সকল লক্ষণ লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল তাহার মধ্যে হইতে যেগুলির উপশম হইয়াছে সেগুলিকে কাটিয়ে দিতে পারেন। তখন কি বাকি রহিল তাহা দেখা যাইবে এবং কোন নতুন লক্ষণ দেখা গেলে তাহা যোগ করিয়া লইতে হইবে।.

প্রকৃত চিকিৎসকের প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় বিষয় হইল প্রাকৃতিক ব্যাধির আরোগ্যসাধনের উপায়সমূহ সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ ; ঔষধসমূহের রোগ উৎপাদনকারী ক্ষমতা সম্বন্ধে অনুসন্ধান। তদ্দ্বারা চিকিৎসাক্ষেত্রে তাহার মধ্য হইতে এমন একটি ঔষধ নির্বাচন করা সম্ভব হইবে যাহার লক্ষণসমষ্টির তালিকা হইতে যে প্রাকৃতিক ব্যাধিকে নিরাময় করিতে হইবে তাহার যতদূরসম্ভব সদৃশ একটি কৃত্রিম ব্যাধি সৃষ্টি কর

নানা ওষুধের রোগ উৎপাদন করিবার ক্রিয়া সমগ্রভাবে অবশ্যই জানিতে হইবে । অর্থাৎ অধিকাংশ প্রাকৃতিক ব্যাধির জন্য তাহার মধ্য হইতে উপযুক্ত হোমিওপ্যাথিক ঔষধ নির্বাচন করিয়া বাহির করিবার পূর্বে যতদূর সম্ভব তাহাদের প্রত্যেকটির কি ব্যাধিলক্ষণ প্রকাশ করিবার, বিশেষত সুস্থদেহে স্বাস্থ্যের কি পরিবর্তন সৃষ্টি করিবার শক্তি আছে, তাহা সমস্তই জানিয়া লইতে হইবে।.

ইহা নির্ধারণ করিতে যাইয়া ওষুধসমূহ যদি কেবল রুগ্ন ব্যক্তিদের উপর পৃথকভাবে একটি করিয়া ও প্রয়োগ করা হয় তাহা হইলে ও তাহাদের প্রকৃত ক্রিয়া সম্বন্ধে সঠিকভাবে কিছুই জানা যাইবে না। কারণ, ঔষধ প্রয়োগের ফলে স্বাস্থ্যের যে বিশেষ পরিবর্তন আশা করা যায় তাহা রোগ লক্ষণের সঙ্গে মিশিয়া যায় এবং সেই জন্য সুস্পষ্টভাবে সেইগুলি লক্ষ্য করা সম্ভব হয় না।

অতএব, সুস্থ মানুষের উপর ছাড়া আর কোন উপায় ঔষধ সমূহের বিশেষ ক্রিয়া সঠিকভাবে জানা যাইতে পারে না । এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কতকগুলি ঔষধ পরিমিত মাত্রায় সুস্থ মানব দেহের উপর প্রয়োগ ও পরীক্ষা ছাড়া আর কোন নিশ্চিত স্বাভাবিক পন্থা নাই। তাহা হইলে, উহাদের প্রভাবে দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কি পরিবর্তন, কি লক্ষণ ও নিদর্শন প্রত্যেকটি দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হইল অর্থাৎ কি প্রকারের পীড়া উৎপন্ন করিবার ক্ষমতা ও প্রবণতা আছে তাহা জানা যাইবে। যেহেতু ইহা প্রমাণিত হইয়াছে (২৪-২৭) যে, ঔষধ সমূহের রোগ আরোগ্যকারী ক্ষমতা তাহাদের মানবদেহের সুস্থ অবস্থাকে পরিবর্তিত করিবার ক্ষমতা মধ্যেই নিহিত আছে এবং তাহার পর্যবেক্ষণের ভিতর দিয়াই আরোগ্যকারী ঔষধের ক্ষমতার প্রকাশ জানা যায়।

আমিই সর্বপ্রথমে এই পথ উন্মুক্ত করিয়াছি এবং তাহা এইরূপ অধ্যাবসায়ের সহিত অনুসরণ করিয়াছি যাহা মানুষের কল্যাণময় সেই মহান সত্যের উপর সুদৃঢ় প্রত্যয় হইতে উথিতএবং তাহার পরিপুষ্ট। সেই প্রত্যয় হইল, একমাত্র হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রয়োগ দ্বারাই মানুষের ব্যাধিসমূহের সুনিশ্চিত আরোগ্য সম্ভব।

আমি আর ও দেখিয়াছি যে ভুলবশত অধিকমাত্রায়, আত্মহত্যা বা অপরকে হত্যা করিবার জন্য কিংবা অন্য কোন অবস্থায় ভেষজদ্রব্যসমূহ সুস্থ মানুষের পাকস্থলীতে যাওয়ার ফলে যে সকল লক্ষণ পূর্ববর্তী গ্রন্থকারগণ পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন তাহা, সেই একই ভেষজ দ্রব্য আমার এবং অন্যান্য সুস্থ ব্যক্তিদের উপর পরীক্ষার ফলে যাহা পর্যবেক্ষণ করা গিয়াছে, বেশ মিলিয়া যায়।যাহাতে অন্য কেহ ব্যবহার না করে প্রধানত সেই কারণে ঐ সকল গ্রন্থকার শক্তিশালী ভেষজসমূহের বিষক্রিয়া যেরূপ ঘটিয়াছিল তাহার ইতিবৃত্ত এবং তাহাদের ক্ষতিকর ক্রিয়া প্রামাণ্যভাবে বিকৃত করিয়াছেন।

ভেষজের বিশুদ্ধ ক্রিয়া সম্বন্ধে আমার পর্যবেক্ষণের সহিত প্রাচীন অভিজ্ঞতার— যদিও তাহা আরোগ্য বিজ্ঞান উপলক্ষ্যে লিপিবদ্ধ করা হয় নাই— যে মিল এবং এই সকল বিবরণের সহিত অন্যান্য লেখকদের একই প্রকারের যে মিল তাহা আমাদের কাছে সহজেই প্রতিপন্ন করে যে ভেষজ পদার্থসমূহ সুস্থ দেহে যে বিকৃতি সাধন করে প্রকৃতির ধ্রুব ও চিরন্তন নিয়ম অনুসারে এবং সেই নিয়মের বশবর্তিহইয়া নিজ নিজ প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে সুনিশ্চিত, নির্ভরযোগ্য ব্যাধিলক্ষণসমূহ উৎপন্ন করতে সমর্থ হয়।

পুরাতন ব্যবস্থাপত্র সমূহে ঔষধ সমূহের অত্যন্ত অধিক মাত্রার প্রায়ই ভয়ঙ্কর কুফলগুলির মধ্যে আমরা এমন কতকগুলি অবস্থা দেখিতে পায় যেগুলি প্রথম দিকে আবির্ভূত হয় নাই, কিন্তু বিষাদময় পরিণামের শেষের দিকে আসিয়াছে এবং ইহা প্রথমে আসা অবস্থা ঠিক বিপরীত। এই সকল লক্ষণ হইল প্রাথমিক ক্রিয়া (৬০ সূত্র) বা জীবনীশক্তির উপর ঔষধের এর যথার্থ ক্রিয়ার ঠিক বিপরীত অর্থাৎ দেহস্হিত জীবনেশক্তির প্রতিক্রিয়া (৬২-৬৭) । সুস্থ দেহের উপর পরিমিত মাত্রায় পরীক্ষণ হইলে কিন্তু ইহা দেখা যায় না বললেই হয়, অল্প মাত্রায় একেবারেই দেখা যায় না। হোমিওপ্যাথিক আরোগ্য বিধানে জীবন্ত শরীরে ঔষধ দ্বারা সেইটুকু মাত্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায় যে টুকু তৎকালীন স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থায় উন্নীত করিবার জন্য প্রয়োজন হয়।

ইহার একমাত্র ব্যতিক্রম হইল অবসাদ ঔষধসমুহ । কারণ, তাহারা প্রাথমিক ক্রিয়ার কখনও কখনও চেতনা ও অনুভূতি, কখন ও উত্তেজনা হরণ করিয়া লয়। এমনকি, সুস্থদেহে পরীক্ষণহেতু পরিমিত মাত্রা প্রয়োগেও তাহাদের গৌণ ক্রিয়ার ঘটে অধিকতার অনুভূতিপ্রবণতা (এবং অধিকতর উত্তেজনা) ।.

এই সকল অবসাদ দ্রব্য ব্যতীত সুস্থ শরীরে পরিমিত মাত্রায় ঔষধের পরীক্ষণে আমরা কেবল দেখিতে পাই তাহাদের প্রাথমিক ক্রিয়া, অর্থাৎ সেই সকল লক্ষণ যাহার ঔষধ মানুষের স্বাস্থ্যের বিশৃঙ্খলা সূচনা করে এবং দেহে দীর্ঘ বা অল্পকালস্থায়ী এক পীড়াবস্তা প্রবর্তন করে।

কতকগুলি ঔষধের ক্ষেত্রে এই সকল লক্ষণের মধ্যে এমন অনেকগুলি দেখা যায় যেগুলি আংশিকভাবে বা কোনো বিশেষ অবস্থায় যে সকল লক্ষণ পূর্বে বা পরে আবির্ভূত হইয়াছে ঠিক তাহার বিপরীত, কিন্তু সেইজন্য সেগুলিকে প্রকৃত গৌণ ক্রিয়া বা জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া মাত্র বলিয়া গণ্য করা উচিত নহে । সেইগুলি হইল প্রাথমিক ক্রিয়ারই অন্তর্গত বিভিন্ন প্রকোল্পের পর্যায়ক্রমিক অবস্থা । তাহাদিগকে পরিবর্তী ক্রিয়া (alternating action) বলা হয় ।

ঔষধ দ্বারা কতকগুলি লক্ষণ ঘন ঘন অর্থাৎ বহু লোকের মধ্যে প্রকাশিত হয়, অন্য কতকগুলি লক্ষণ অপেক্ষাকৃত বিরলভাবে কিংবা অল্প কয়টি লোকের মধ্যে, আবার কয়েকটি লক্ষণ কেবলমাত্র খুব অল্প কয়টি সুস্থ দেহে দেখা যায়।

তথাকথিত ধাতু প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য (idiosyncracies) শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্গত। ইহার অর্থ হইল, দেহের কতকগুলি বিশেষ ধাতু যাহা অন্যভাবে সুস্থ হইলে ও কতগুলি দ্রব্য দ্বারা তাহাদের অল্পাধিক পীড়িত হইবার প্রবণতা তাহাতে দেখা যায়।অথচ সেই সকল দ্রব্য ওপর অনেক লোকের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব বিস্তার করে না বা কোন পরিবর্তন আনে না । কিন্তু প্রত্যেককে প্রভাবিত করিবার এই যে অক্ষমতা তাহা কেবল আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান ।যেহেতু মানুষের সুস্থ দেহে এই সকল ও অন্যান্য পীড়ার লক্ষণ উৎপাদন করিতে দুইটি বিষয়ের প্রয়োজন, প্রভাবক পদার্থের সহজাত ক্ষমতা এবং দেহের চৈতন্যদায়িনী জীবনীশক্তির ইহার দ্বারা প্রভাবিত হইবার প্রবণতা সেইহেতু, তথাকথিত ধাতুপ্রকৃতিবিশিষ্ট লোকের স্বাস্থ্যের সুস্পষ্ট শৃংখলার কারণকে শুধুমাত্র তাহাদের গঠন বৈশিষ্ট্যের উপর ন্যস্ত করা যায় না; সেই সকল পীড়া উৎপাদনকারী পদার্থসমূহও— তাহাদের মধ্যে সমস্ত মানবদেহেই একই প্রকার প্রভাব বিস্তার করিবার ক্ষমতা নিহিত আছে, অথচ তাহা এইরূপ যে অতি অল্প কয়েকটি সুস্থ দেহের তাহাদের দ্বারা পীড়িত হইবার প্রবণতা দেখা যায়—সে জন্য দায়ী। এই সকল পদার্থ যে প্রকৃতই প্রত্যেকটি সুস্থ ব্যক্তির উপর ক্রিয়াশীল তাহা ইহা হইতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে,ঔষধ রূপে তাহা যখন ব্যবহৃত হয় তখন তাহারা হোমিওপ্যাথি মতে সকল অসুস্থ ব্যক্তিরই সেই সকল পীড়ালক্ষণ বিষয়ে উপকার সাধন করে যেগুলি তথাকথিত ধাতুপ্রকৃতি গ্রস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রতীয়মান লক্ষণসমূহের সদৃশ।

প্রত্যেকটি ঔষধ মনুষ্যদেহের উপর বিশেষ ক্রিয়া প্রদর্শন করে—অন্যজাতীয় ভেষজপদার্থ দ্বারা ঠিক একই প্রকারে প্রকাশিত হয় না।

প্রত্যেক শ্রেণীর উদ্ভিদ যেমন বাহ্যিক আকারে জীবনধারণ পদ্ধতিতে বৃদ্ধির দিক হইতে স্বাদে-গন্ধে অন্য শ্রেণীর প্রত্যেকটি উদ্ভিদ হইতে স্বতন্ত্র, প্রত্যেকটি খনিজ ও লবণ জাতীয় পদার্থ যেমন বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীক প্রকৃতিতে ও রাসায়নিক গুণাবলীতে অন্য জাতীয় খনিজ ও লবণ জাতীয় পদার্থ হইতে নিশ্চিত ভাবেই পৃথক, ঠিক তেমনভাবে তাহারা রোগ সৃষ্টিকারী শক্তি এবং আরোগ্যকারী শক্তিতেও নিশ্চিতভাবেই পরস্পর সম্পূর্ণ পৃথক ও বিপরীত। এই সমস্ত দ্রব্য অদ্ভূত, পৃথক এবং সুনির্দিষ্ট ধারায় মানবস্বাস্থ্য পরিবর্তন করিতে সমর্থ। কাজেই ইহাদের একটিকে অন্যটির সহিত ভুল করিবার বা মিশ্রিত করিবার কোনো সম্ভাবনা থাকেনা।

অতএব, যে ঔষধের উপর মানুষের জীবন, মৃত্যু, পীড়া ও স্বাস্থ্য নির্ভর করে তাহা সম্পূর্ণভাবে ও সর্বাধিক সাবধানের সহিত চিনিয়া লইতে হইবে এবং এই উদ্দেশ্যে সুস্থ দেহের উপর সযত্ন ও বিশুদ্ধ পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা তাহাদের ক্ষমতা ও প্রকৃত ক্রিয়া নির্ধারণ করিতে হইবে যাহাতে তাহাদের সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান লাভ করা যায় এবং পীড়ায় তাহাদের প্রয়োগ সম্বন্ধে কোন ভুল না হয়। কারণ, কেবল তাহাদের সঠিক নির্বাচন দ্বারাই সর্বোত্তম পার্থিব সূখস্বরূপ দেহ ও মনের স্বাস্থ্য দ্রুত ও স্থায়ীভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

স্বাস্থ্য বিপর্যয় ক্ষমতার উপর নির্ভর করিয়া ঔষধকে প্রধানতঃ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- উগ্রবীর্য পদার্থ, মৃদুবীর্য পদার্থ এবং অতি লঘুবীর্য পদার্থ। সুস্থ মানবদেহের উপর ঔষধ এর ফলাফল পরীক্ষা করিবার সময় মনে রাখিতে হইবে যে, উগ্রবীর্য পদার্থগুলি অতি অল্প মাত্রায় প্রয়োগ করলেও বলিষ্ঠ গঠন ব্যক্তির স্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। মৃদুবীর্য পদার্থগুলি স্থল মাত্রায় প্রয়োগ করা দরকার, নতুবা হয়তোবা লক্ষণসমূহ প্রকাশ করিতে অসমর্থ হইতে পারে। অতি লঘুবীর্য পদার্থগুলি নীরোগ অথচ দুর্বল, উত্তেজনাপ্রবণ ও অনুভূতিশীল ব্যক্তির উপর প্রয়োগ করিতে হইবে। নতুবা স্থুল মাত্রায় হয়তোবা ইহার নিজস্ব লক্ষণ প্রকাশ করিতে অপারগ হইতে পারে।

এই সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষায়—যাহার উপর সমগ্র চিকিৎসা কলার যথার্থ এবং ভাবী মানুশ্য সমাজের কল্যাণ নির্ভর করে—-সম্পূর্ণ সুপরিচিতএবং যাদের বিশুদ্ধতা, ও কৃত্তিমতা ও কার্যকারিতা সম্বন্ধে আমরা সম্পূর্ণভাবে সুনিশ্চিত এইরূপ ঔষধ ব্যতিরেকে অন্য কোন ঔষধ প্রয়োগ করা উচিত নহে।.

এই সকল ঔষধের প্রত্যেকটিকে সম্পূর্ণ ও অবিমিশ্র ও অবিকৃত অবস্থায় গ্রহণ করিতে হইবে, দেশীয় গাছ গাছরা হইতে রস টাটকা নিংড়াইয়া লইয়া ও নষ্ট হইয়া যায় সেজন্য তাহার সহিত একটু সুরাসার মিশাইয়া, বিদেশি উদ্ভিজ্জাদি চূর্ণ আকারে বা তাহাদের টাটকা অবস্থায় থাকাকালে সুরাসার সহযোগে নির্যাস টিংচার প্রস্তুত করিয়া এবং পরে নির্দিষ্ট অনুপাতে জল মিশাইয়া এবং লবণ ও আঠাজাতীয় ভেষজকে ব্যবহার করিবার ঠিক পূর্বে জলে গুলিতে হইবে। উদ্ভিদকে যদি কেবল শুষ্ক আবহাওয়ায় সংগ্রহ করা সম্ভব হয় এবং তাহার কার্যকরী শক্তি স্বভাবতই যদি কম হয় তাহা হইলে তাহা ছোট ছোট টুকরা করিয়া কাটিয়া লইয়া ভেষজ অংশ বাহির করিয়া লইবার জন্য তাহার উপর গরম জল ঢালিয়া নির্যাস প্রস্তুত করিয়া লইতে হইবে এবং প্রস্তুত হইবামাত্র গরম থাকিতে থাকিতে খাইতে হইবে, যেহেত নিংড়ানো সকল উদ্ভিজ্জরস এবং সকল জলীয় নির্যাস সুরাসার মিশ্রিত না থাকিলে দ্রুত গুজিয়া উঠে ও পচিয়া যায় এবং তার ফলে তাহাদের সকল ভৈষজ্য গুণ নষ্ট হইয়া যায়।

এই সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রত্যেকটি ভেষজ পদার্থ সম্পূর্ণ আলাদা ভাবে এবং বিশুদ্ধ অবস্থায় বাহিরের আর কিছু না মিশাইয়া প্রয়োগ করিতে হইবে।সেই দিন, কিংবা পরবর্তী কিছুদিন বরং ওষুধের গুনাগুন পর্যবেক্ষণের সময়ের মধ্যে ঔষধ জাতীয় আর কিছু গ্রহণ করার চলিবে না।

যতদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলিবে ততদিন পথ্যকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে। উহা যথাসম্ভব মসলা বর্জিত, কেবল পুষ্টিকর ও সাদা-সিদা ধরনের হওয়া উচিত । কাঁচা তরিতরকারি, মূল, সবরকম স্যালাড ও শাকাদির ঝোল ( যাহা খুব সাবধানতার সহিত তৈয়ারি হইলেও তাহাতে গোলযোগকারি কিছু ভেষজগুণ বর্তমান থাকে) বর্জন করা উচিত । যে সকল পানীয় সর্বদা ব্যবহার করা হয় তাহা যতদূর সম্ভব কম উত্তেজক হওয়া উচিত।

যাহার উপর ওষুধের পরীক্ষণ হইবে তাহা কে অবশ্যই বিশ্বাস ভাজন ও বিবেকবান হইতে হইবে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়ে ও দেহের সকল প্রকার অতিরিক্ত পরিশ্রম, সকল প্রকার অমিতাচার ও বিরক্তিকর কামুকতা তাহাকে পরিহার করিয়া চলিতে হইবে । চিত্তচঞ্চলকারী জরুরি কাজের কোন আকর্ষণ তাহার থাকিবে না, সযত্ন আত্মসমীক্ষায় নিজেকে নিবিষ্ট রাখিতে হইবে এবং এইরূপ থাকাকালে কোনমতেই অস্থির হওয়া চলিবে না । তাহার পক্ষে যাহা সুব্যবস্থা সেই অবস্থায় তাহার দেহকে রাখিতে হইবে এবং সঠিকভাবে তাহার অনুভূতি সকল প্রকাশ ও বর্ণনা করিতে পারার মতো তাহার যথেষ্ট পরিমাণে বুদ্ধি থাকা প্রয়োজন।

ঔষধ সমুহ পুরুষ ও স্ত্রী উভয় ক্ষেত্রেই পরীক্ষা করিতে হইবে যাহাতে জননেন্দ্রিয় সংক্রান্ত স্বাস্থ্যের পরিবর্তনসমূহ পরিজ্ঞাত হওয়া যায় .

খুব সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের ফলে লক্ষ্য করা গিয়েছে যে, গুনাগুন পরীক্ষার জন্য ভেষজ পদার্থকে অবস্থায় পরীক্ষণ করা হইলে, তাহাদের অন্তনির্হিত পূর্ণশক্তির বিকাশ প্রায় দেখা যায় না । সেই শক্তি পূর্ণভাবে পরিস্ফুট হয় যখন সেগুলিকে যথাযথভাবে চূর্ণ করিয়া ও ঝাকি দিয়ে উচ্চ শক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়। স্হূল অবস্থায় যে শক্তি তাহাদের মধ্যে সুপ্তপ্রায় থাকে এই রূপ সহজ উপায় দ্বারা তাহা অবিশ্বাস্য পরিমাণে বর্ধিত হয় এবং ক্রিয়াশীল হইয়া উঠে। যে সকল দ্রব্য অত্যন্ত মৃদু প্রকৃতির বলিয়া ধারণা আছে সেগুলির ও ভেষজ শক্তি এখন নির্ধারণ করার পক্ষে এইটি সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা বলিয়া আমরা মনে করি। যে প্রণালী আমরা অবলম্বন করি তাহাতে খালি পেটে পরীক্ষণ কারীকে প্রত্যহ পশুদের ত্রিশক্তির চারিটি হইতে ছয়টি ছোট বড়ি জলে ভিজাইয়া অল্পাধিক জলে উত্তমরূপে মিশাইয়া দেওয়া হয় এবং কয়েক দিন ধরিয়া এইরূপ ব্যবস্থা চালানো হয় ।.

এই মাত্রায় ফল যদি কম হইতে দেখা যায় তাহা হইলে প্রত্যহ আরও কয়েকটি বড়ি ব্যবহার করা যাইতে পারে যে পর্যন্ত না তারা আরো পরিস্ফুট ও জোরালো হয় এবং স্বাস্থ্যের পরিবর্তন আর ও সুস্পষ্ট হয়; কারণ সকল লোক একটি ঔষধ দ্বারা সমান ভাবে প্রভাবিত হয় না, বরং এই বিষয়ে অনেক বিভিন্নতা দেখা যায়। সেই জন্য শক্তিশালী বলিয়া পরিচিত ঔষধের মাত্রা দুর্বল বলিয়া প্রতীয়মান ব্যক্তির উপর কখনও কখনও আদৌ প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায় না; অথচ অপেক্ষাকৃত মৃদু ধরনের ঔষধ দ্বারা সেই ব্যক্তি অত্যন্ত প্রবল ভাবে আক্রান্ত হয়। অপরপক্ষে আবার বেশ বলিষ্ঠ লোকেরা মৃদু বলিয়া প্রতীয়মান ঔষধ দ্বারা অত্যাধিক প্রভাবিত হইয়া পড়ে এবং কড়া প্রকৃতির ঔষধে সামান্য লক্ষণ মাত্র প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে যখন পূর্ব হসূত্রঃ ১৩০। ঔষধের ক্রিয়ার ভোগকাল কেবলমাত্র কতকগুলি পরীক্ষার ফল তুলনা করিয়া নির্ধারণ করা সম্ভবইতে কিছু জানা যায় না তখন প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে ঔষধের অল্পমাত্রায় লইয়া আরম্ভ করা সঙ্গত এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দিনে দিনে মাত্রা বাড়ানো যাইতে পারে ।.

শুরুতেই প্রথম মাত্রার পরিমাণ যদি অনেক বেশী হইয়া যায় তাহা হইলে এই সুবিধা হয় যে, পরীক্ষণকারী লক্ষণগুলির ক্রম বুঝিতে পারে এবং কোন সময়ে প্রত্যেকটির আবির্ভাব ঘটিয়াছে তাহা ঠিক ঠিক লিখিয়া রাখিতে পারে।ঔষধ এর স্বরূপ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভের পক্ষে অত্যাবশ্যক কারণ, তাহা হইলে প্রাথমিক ক্রিয়ার ও পর্যায়গত ক্রিয়ার ক্রম একেবারে নিঃসংশয়ভাবে লক্ষ্য করা যায়। অত্যন্ত পরিমিত মাত্রা দ্বারা ও এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলিতে পারে যদি পরীক্ষাকারীর যথেষ্ট পরিমাণে সূক্ষ্ম অনুভবশক্তি থাকে এবং সে যদি তাহার অনুভূতিসমূহের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী হয়। ঔষধের ক্রিয়ার ভোগকাল কেবলমাত্র কতকগুলি পরীক্ষার ফল তুলনা করিয়া নির্ধারণ করা সম্ভব

কিন্তু যদি কোন কিছু নির্ধারণের জন্য একে ঔষধ ক্রমবর্ধমান মাত্রায় পরপর কয়েকদিন একই লক্ষ্যে দেওয়া হয় তাহা হইলে তদ্দ্বারা সাধারণভাবে ওষুধজনিত পীড়ার বিভিন্ন অবস্থা নিঃসন্দেহে জানিতে পারি, কিন্তু সেগুলি পর পর কিভাবে আসিল তাহা জানিতে পারি না। আর পরবর্তী মাত্রা আরোগ্যকারী রূপে প্রায়ই পূর্ব মাত্রাজনিত একটি না একটি লক্ষণকে দূরীভূত করে কিংবা তাহার পরিবর্তে একটি বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি করে। এই রূপ উৎপন্ন লক্ষণ সংশয়মূলক বলিয়া সেগুলিকে বন্ধনীর মধ্যে লেখা উচিত—যে পর্যন্ত না পরবর্তী আর ও বিশুদ্ধ পরীক্ষা দ্বারা নির্ধারিত হয় যে সেগুলি দেহের প্রতিক্রিয়ার (গৌণক্রিয়া) লক্ষণ বা ওষুধজনিত পরিবর্তী ক্রিয়ালক্ষণ ।

কিন্তু যখন লক্ষণের পর্যায়ক্রমিক সম্বন্ধে এবং ঔষধের ভোগকালবিষয় লক্ষ নারাখিয়া কেবলমাত্র লক্ষণগুলি নির্ধারণ করা উদ্দেশ্য হয় ( বিশেষ করে মৃদু প্রকৃতির ঔষধের), তখন শ্রেয় পন্থা হইল পরপর কয়েকদিন ধরিয়া মাত্রা বৃদ্ধি করিয়া ঔষধ দেওয়া । এইভাবে অপরিচিত অথচ মৃদুতম ঔষধ এর ক্রিয়া ও প্রকাশিত হইয়া পড়িবে বিশেষতঃ যদি তারা অনুভূতিশীল ব্যক্তির উপর পরীক্ষিত হয়।

ঔষধ জনিত কোন বিশেষ অনুভূতি বা লক্ষণ উপস্থিত হইলে উহার সঠিক পরিচয় পাইবার জন্য বিভিন্ন অবস্থায় অবস্থান করিয়া, আক্রান্ত অঙ্গ সঞ্চালন করিয়া, ঘরের মধ্যে বা মুক্ত বাতাসে হাঁটিয়া, দাঁড়াইয়া, শুইয়া উহা বাড়ে, কমে বা দূরীভূত হয় তাহা পর্যবেক্ষণ করা শুধু উচিত নয় প্রয়োজন ও বটে। যে অবস্থায় লক্ষণটি প্রথম দেখা গিয়েছিল সেই অবস্থা পুনরায় গ্রহণ করিলে লক্ষণ আবার ফিরিয়া আসে কিনা, পানভোজনে, অন্য কোন অবস্থায়, কথা বলায়, কাশিবার হাঁচিবার সময়ে বা দেহের অন্য কোন ক্রিয়ায় লক্ষণটির কোন পরিবর্তন দেখা যায় কিনা তাহা লক্ষ্য করিতে হইবে, আর সেইসঙ্গে ইহা ও জানিতে হইবে যে দিন বা রাত্রির কোন সময়ে তাহা সর্বাপেক্ষা প্রকাশমান হয় । এতদ্বারা প্রত্যেকটি লক্ষণের বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির পরিচয় পাওয়া যাইবে ।

বাহ্য প্রভাবসমূহের, বিশেষ করিয়া ভেষজের এরূপ শক্তি আছে, যদ্দারা জীবদেহের স্বাস্থ্যেএকপ্রকার বিশেষ পরিবর্তন উৎপন্ন হইতে পারে এবং তাহা তাহাদেরই নিজস্ব প্রকৃতি অনুসারে । কিন্তু কোন ভেষজের নিজস্ব প্রকৃতিগিত সকল লক্ষণ একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে, একই সঙ্গে, কিংবা একই পরীক্ষাকালে আবির্ভূত হয় না। পরন্তু, কতকগুলি লক্ষণ কাহারো ক্ষেত্রে প্রধানত একবারে আবার কারো ক্ষেত্রেদ্বিতীয় বা তৃতীয় পরীক্ষা কালে আসিয়া উপস্থিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ওপর এমন কতকগুলি লক্ষণ দেখা যায়, যাহার মধ্যে কিছু হয়তো, চতুর্থ, অষ্টম বা ব্যক্তির মধ্যে প্রকাশ পাইয়াছে যাহা আবার পূর্বেই দ্বিতীয়, ষষ্ঠ বা নবম ব্যক্তির মধ্যে দেখা গিয়েছে এবং একইভাবে চলিতে থাকে। উপরন্ত সেইগুলির একই সময়ে আবির্ভাব নাও ঘটতে পারে।

কেবল বিভিন্ন ধাতুবিশিষ্ট স্ত্রী-পুরুষের উপযুক্ত ক্ষেত্রে বহু পর্যবেক্ষণ দ্বারা কোন ভেষজসৃষ্ট ব্যাধির সমগ্র প্রকাশকে সম্পূর্ণ করিয়া তোলা যায়। রোগ উৎপাদনকারী ক্ষমতা অর্থাৎ স্বাস্থ্যকে পরিবর্তন করিবার যথার্থ শক্তি সম্বন্ধে কোন ভেষজ সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষিত হইয়াছে বলিয়া আমরা তখনই নিশ্চিত হইতে পারি যখন পরবর্তী পরীক্ষাকগণ তাহার ক্রিয়া হইতে আর বিশেষ নূতন কিছুই না এবং প্রায় সকল লক্ষণ এ দেখিতে পান যেগুলি পূর্ববর্তী পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন।

Lযেমন পূর্বে বলা হইয়াছে, একটি ভেষজকে সুস্থ দেহে পরীক্ষণ করা হইলে কোন একটি ক্ষেত্রে যে সকল পরিবর্তন আনয়ন করিতে সমর্থ যদিও তাহার সকল গুলি উৎপাদন করিতে পারে না এবং দৈহিক ও মানসিক ধাতু প্রকৃতির তারতম্য অনুসারে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ইহা প্রয়োগ করা হয়লেই কেবল ইহা সম্ভব হয়, তথাপি প্রকৃতির এক শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম অনুসারে প্রত্যেকটি মানুষের ক্ষেত্রে সকল লক্ষণ উৎপন্ন করিবার প্রবণতা সেই ভেষজের মধ্যে বিদ্যমান থাকে (সূত্র১১৭) । সেই প্রবনতার জন্য তাহার সকল গুণ—-এমন কি, যেগুলি সুস্থ শরীরে কদাচিৎ প্রকাশ পায়—তাহা সদৃশ লক্ষণ অনুসারে প্রয়োগ করা হইলে প্রত্যেকটি পীড়িত ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। তাহা তখন হোমিওপ্যাথি মতে নির্বাচিত বলিয়া ক্ষুদ্রতম মাত্রাতে ও রোগীর রোগীর ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে প্রাকৃতিক পীড়ার খুব সদৃশ একটি কৃত্রিম অবস্থার সৃষ্টি করে—যাহা দ্রুত ও স্থায়ীভাবে রোগমুক্ত করিয়া তাহাকে আরোগ্য প্রদান করে।

পর্যবেক্ষণের সুবিধার জন্য যদি আমরা এমন একজনকে নির্বাচিত করি যে সত্যপ্রিয়, সর্বপ্রকারে সংযমী, সুক্ষ্ম বোধশক্তিসম্পন্ন এবং যিনি তাঁহার অনুভূতি সম্পর্কে একান্ত মনোযোগী তাহা হইলে কতকটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ঔষধের মাত্রা যত বেশি পড়িবে ততই তাহার প্রাথমিক লক্ষণ গুলি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠিবে এবং জীবনীশক্তির প্রতিক্রিয়া বা গৌনক্রিয়ার সহিত মিশ্রিত না হইয়া সর্বাপেক্ষা জ্ঞাতব্য কেবলমাত্র সেই সকল লক্ষণই আবির্ভূত হইতে থাকিবে। কিন্তু যখন অপরিমিত বৃহৎ মাত্রা ব্যবহার করা হয়, তখন লক্ষণ গুলির মধ্যে কতকগুলি গৌণ ক্রিয়ার ফল ও যে শুধু থাকিবে তাহাই নহে, প্রাথমিক ক্রিয়া ও এত তাড়াহুড়ো ও ব্যস্ত ভাবে আসিয়া উপস্থিত হইবে যে, কিছুই সঠিকভাবে তখন লক্ষ্য করা সম্ভব হইবে না। ইহার সঙ্গে বিপদের সম্ভাবনা জড়িত আছে তাহা ছাড়িয়ে দিলেও যাহার কিছুমাত্র মানবতাবোধ আছে এবং যে মানুষকে ও ভ্রাতৃজ্ঞানে দেখিয়ে থাকে, সে কখনো তাহা অপেক্ষার বিষয় বলিয়া মনে করিবে না।

ঔষধের ক্রিয়াকালে পরীক্ষণকারীর সকল অসুস্থ, আকস্মিক ঘটনা ও স্বাস্থ্যের পরিবর্তন ( অবশ্য যদি উত্তম ও বিশুদ্ধ পরীক্ষণ এর জন্য ১২৪-১২৭) সূত্রে উদ্বৃত শর্তগুলি মানিয়ে চলা হয়) কেবলমাত্র ঔষধ হইতে উদ্ভূত এবং তাহা ওষুধেরই বিশেষত্ব বলিয়া গণ্য করিতে ও লিপিবদ্ধ করিতে হইবে। যদি পরীক্ষণ কারীর একই প্রকার ঘটনা বহুকাল পূর্বে ও হইয়া থাকে তাহা হইলে ও সেগুলিকে ঔষধেরই লক্ষণ লক্ষণ বলিয়া ধরিতে হইবে। ঔষধের পরীক্ষণ কালে সেগুলির পুনরাবির্ভাব ইহাই নির্দেশ করে যে, সেই ব্যক্তির বিশেষ ধাতু প্রকৃতির জন্য ওই প্রকার লক্ষণের প্রবণতা হইয়াছে। এই ক্ষেত্রে তাহা ঔষধেরই ক্রিয়া । যতদিন স্বাস্থ্যের উপর ঔষুধের মেয়াদ চলিতে থাকে লক্ষণসমূহ আপনা হইতেই উদ্ভূত হয় না, ঔষধ দ্বারাই উৎপন্ন হয় ।

চিকিৎসক নিজের উপর ঔষুধের পরীক্ষণ না করিয়া যদি অন্য কাহারও উপর করেন, তাহা হইলে সেই ব্যক্তি তাহার নিজের অনুভূতি, অসুস্থতাবোধ, আকস্মিক ঘটনা এবং স্বাস্থ্যের পরিবর্তন সম্বন্ধে যেরূপ অভিজ্ঞতা হয় তাহা স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করিবে । ঔষধ সেবনের কত পরে লক্ষণ এর আবির্ভাব ঘটিল এবং তাহা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে তাহার ভোগকালও উল্লেখ করিতে হইবে। পরীক্ষা শেষ হওয়া মাত্র চিকিৎসক সেই বিবরণ পরীক্ষা কারীর উপস্থিতিতে দেখিয়ে লইবেন বা পরীক্ষণ যদি কয়েকদিন ধরিয়া চলে তবে তিনি প্রত্যেহ এরূপ করিবেন। প্রত্যেকটি বিষয় টাটকা মনে করার সময়েই তাহার ঠিক প্রকৃতি জিজ্ঞাসা করিয়া লইতে হইবে এবং এই ভাবে প্রাপ্ত খুঁটিনাটি সঠিক বিবরণ লিখিয়া লইতে হইবে অথবা পরীক্ষাকারী যেভাবে চাহে সেইভাবে অদলবদল করিতে লইতে হইবে।.

Lযদি সেই ব্যক্তি লিখিতে না পারে তাহা হইলে প্রত্যহ কি ঘটিয়েছে ও কিভাবে ঘটিয়াছে তাহা চিকিৎসককে জানাইতে হইবে। এই বিষয়ে যাহা বিশ্বাসযোগ্য বলিয়া লিখিতে হইবে তাহা প্রধানত পরীক্ষণকারীর স্বতঃপ্রবৃত্ত বিবরণ হওয়া উচিত, তাহাতে অনুমাননির্ভর কিছুই থাকিবে না এবং কোন প্রশ্ন সোজাভাবে করা হইলে তাহার উত্তর যত কম সম্ভব তাহাতে স্থান পাইবে। দ্রষ্টব্য বিষয়ের অনুসন্ধান এবং প্রাকৃতিক রোগের চিত্রাঙ্গনের জন্য যে সকল সাবধানতার উপদেশ (সূত্র ৮৪-৯৯) আমি বিবৃত করিয়াছে তাহার সকল কিছুই সেই প্রকার সাবধানতার সহিতই নির্ধারণ করিতে হইবে ।

সাধারণ ওষুধের বিশুদ্ধ ক্রিয়া দ্বারা মানুষের স্বাস্থ্যের উপর কি পরিবর্তন আসতে পারে এবং তদ্বারা সুস্থ দেহে কি প্রকার কৃত্তিম ব্যাধি ও লক্ষণসমূহ উৎপন্ন হইতে পারে তাহার সর্বোত্তম পরীক্ষণ সম্ভব যদি তাহা স্বাস্থ্যবান, সংস্কারমুক্ত এবং অনুভূতিপ্রবণ চিকিৎসক, এখানে যে সকল যত্ন ও সাবধানতা কথা বলা হইয়াছে উহা মানিয়া, নিজের উপর করেন। নিজের দেহে যাহা-কিছু তিনি প্রত্যক্ষ করেন তাহা তিনি অত্যন্ত সুনিশ্চিত ভাবে উপলব্ধি করিয়া থাকেন।

কিন্তু আরোগ্য- প্রদানকল্পে প্রযুক্ত অবিমিশ্র ঔষধের কতকগুলি লক্ষণকে মূল রোগের লক্ষণ সমূহ হইতে এমন কল্যানৈপুণ্যের বিষয়ীভূত এবং যাহারা পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত পারদর্শী তাহাদের উপর তাহা ছাড়িয়া দিতে হইবে ।

এইরূপে সুস্থ মানব দেহে অনেকগুলি অবিমিশ্র ঔষধ পরীক্ষা করিয়া কৃত্তিম উৎপাদনকারী রূপে তাহারা যেসকল উৎপাদন ও লক্ষণ সৃষ্টি করিতে সমর্থ সেগুলি যদি যত্ন সহকারে ও বিশ্বস্ততার সহিত আমরা লিখি তবে আমরা প্রকৃত মেটেরিয়া মেডিকা (ভৈষজ্ বিজ্ঞান) পাই । সেটি হইল অবিমিশ্র ও ঔষধসমূহের যথার্থ, বিশুদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্য ক্রিয়া প্রণালীর সংগ্রহ, প্রকৃতি দেবীর একখানি গ্রন্থ, যাহাতে শক্তিশালী ঔষধ সমুহ দ্বারা উদ্ভূত স্বাস্থ্যের বিশেষ পরিবর্তন ও লক্ষণসমূহ যেভাবে পর্যবেক্ষকের কাছে ধরা পড়িয়াছে সেইভাবে লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে এবং যাতে পরে সেই সকল ঔষধ দ্বারা আরোগ্যযোগ্য অনেক প্রাকৃতিক সদৃশ চিত্র সন্নিবেশিত আছে। এককথায় তাহার মধ্যে আছে কৃত্তিম পীড়ার অবস্থা সমূহ যাহা তাহাদের সদৃশ প্রাকৃতিক পীড়ার সুনিশ্চিত ও স্থায়ী আরোগ্যের জন্য একমাত্র প্রকৃত, হোমিওপ্যাথিক অর্থাৎ অমোঘ নিরাময়ের উপায় প্রদান করে।

এই মেটেরিয়া মেডিকা হইতে যাহা কিছু অনুমান নির্ভর, কেবল কথার কথা কিংবা কল্পনাপ্রসূত নিষ্ঠার সহিত বর্জন করিতে হইবে। তাহার প্রত্যেকটি হইবে যত্ন ও সরলতার সহিত জিজ্ঞাসিত প্রকৃতির ভাষা।.

বাস্তবিকই কেবলমাত্র মানুষের স্বাস্থ্যের পরিবর্তন আনয়নকারী বহুসংখ্যক ভেষজের বিশুদ্ধ ক্রিয়া প্রণালীর সহিত সঠিক পরিচয়ের ভিতর দিয়া অগণিত প্রাকৃতিক পীড়ার প্রত্যেকটির জন্য এবং জগতের প্রতিটি ব্যাধির জন্য আমরা একটি উপযুক্ত কৃত্রিম (আরোগ্যদানকারী) পীড়ার সাদৃশ্যযুক্ত একটি হোমিওপ্যাথিক ঔষধ আবিষ্কার করিবার যোগ্যতা লাভ করিতে পারি। লক্ষণসমূহের যথার্থতা এবং শক্তিশালী ভেষজসমূহের প্রত্যেকটির ক্রিয়ার দ্বারা সুস্থ দেহের উপরে যে সকল প্রচুর রোগ উপাদানের পরিচয় পাওয়া গিয়েছে তাহাকে ধন্যবাদ; ইতোমধ্যে এখনই অতি অল্পসংখ্যক রোগ আছে যাহার জন্য বিশুদ্ধ ক্রিয়া সম্বন্ধে অধুনা পরীক্ষিত ঔষধ সমূহের মধ্য হইতে একটিকে পাওয়া যায় না । তাহা বিশেষ কোন গোলযোগ সৃষ্টি না করিয়া মৃদু, সুনিশ্চিত ও স্থায়ীভাবে, মিশ্রিত ও অজ্ঞাত ওষুধসমূহ সম্মানিত পুরাতন এলোপ্যাথিক চিকিৎসাকলার সাধারণ ও বিশেষ ভেষজ বিজ্ঞান দ্বারা সাধিত চিকিৎসা অপেক্ষা বহুগুণে নিশ্চিত ও নিরাপদে স্বাস্থ্য পুনঃপ্রদান করিতে পারে । এই প্রকার মিশ্রিত ঔষধ প্রয়োগে কেবল রোগের বৃদ্ধি ছাড়া রোগসমূহ তো নিরাময় হয়ই না, অচিরপীড়াতেও আরোগ্যদানের সহায়ক না হইয়া বাধা সৃষ্টি করে ও প্রায়ই জীবনকে বিপদগ্রস্ত করে ।

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipisicing elit, sed do eiusmod tempor incididunt ut labore et dolore magna aliqua. Ut enim ad minim veniam, quis nostrud exercitation ullamco laboris nisi ut aliquip ex ea commodo consequat.