lifocyte.com

ADHD শিশুর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

ADHD -অতিদুষ্ট ও অমনোযোগী শিশুর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

শিশুর ADHD কি ?

ADHD এর পূর্ণরুপ Attention deficit hyperactivity disorders । Attention Deficit মানে মনোযোগের অভাব, আর hyperactivity মানে অতি চাঞ্চল্য। একথায় বলাযায় বলতে পারি “অতি কর্মচঞ্চল, অমনোযোগীতামূলক মানসিক সমস্যা”।  বেশিরভাগ শিশুর মধ্যেই কমবেশি ADHDএর প্রভাব রয়েছে। হাইপার অ্যাকটিভ বাচ্চা মানেই সে ADHD এডিএইচডিতে আক্রান্ত, এমন ধারণা সঠিক নয়। শিশু মাত্রই দুরন্তপনা, চঞ্চল, উৎফুল্ল , সমবয়সী ও সহোদরদের সঙ্গে ঝগড়া করবে। শুধু খেয়াল রাখতে হবে আপনার শিশুটি যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায়। মাত্রতরিক্ত হলে সেটাকে রোগ বলা হয়ে থাকে এরুপ শিশুর জন্য  হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা খুব কার্যকর।
হ্যাম্বার্গ ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী এবং সাইকোথেরাপিস্ট অধ্যাপক মিশেল শুলটে-মার্কউর্ট মতে ‘ADHD রোগীদের মনের ভেতরটা উত্তেজনায় ভরা থাকে৷ তারা বেশ মনোযোগী হয়৷ তবে একটা কাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারে না৷ কারণ হঠাৎ করে নতুন কিছুর আবির্ভাব হলে তারা আবার সেই কাজটায় লেগে যায়৷ শিশুদের ছাড়াও প্রাপ্তবয়স্কেদেরও এই ব্যাধি হয়ে থাকে ।

ADHD -এ কার্টুন ছবি ও ভিডিও গেমের প্রভাব

ADHD কারণ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এর নির্দিষ্ট কারণ নির্ণয় এখনো সম্ভব হয়নি। কার্টুন ছবি ও ভিডিও গেমের উপকারিতার  বর্ণনায় আমি খুব আশ্চর্য  হয়ে যাই । আর কেন এটার সুদূর প্রসারি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আলচনা হয় না । আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আপনার শিশু জানালার গ্রিল , ফার্নিচারের উপর , গাছে গাছে, বিভিন্ন স্থানে বাদুর ঝোলা হয়ে লাফালাফি করতে অভ্যস্থ । এজন্য বেশিরভাগ অভিভাবক অতিষ্ঠ হয়ে যায় ।

প্রায় প্রতিটি কার্টুন ছবির আচরণ শিশুর মধ্যে প্রভাবিত হয়ে থাকে । শিশুরা অনুকরণ প্রিয় হয়ে থাকে ।

তাই আমার মতে বর্তমানে কার্টুন ছবি ও ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে শিশুর অতি কর্মচঞ্চল, অমনোযোগীতামূলক মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে। কিছু কিছু মা সন্তানকে খাওয়ানোর ও ব্যাস্ত রাখার সুন্দর পদ্ধতি হিসেবে নিয়েছেন কার্টুন ছবি ও মোবাইল গেম। শিশুর  ADHD  মুক্ত করতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা এবং শিশুর সাইকোথেরাপি ও মানসিক পরিচর্যা করা আবশ্যক ।

ADHD  এর কারণ

  • শরীরে জিংকের ঘাটতি ও শিশু খাদ্যের সঙ্গে মেশানো কৃত্রিম রং এডিএইচডি জন্ম দিতে পারে।
  • অপুষ্টিজনিত কারণে এবং বংশগত কারণে শিশুর মধ্যে এই রোগ দেখা দিতে পারে।
  • অতিরিক্ত এন্টবায়োটিক মেডিসিনের সাইডে এফক্ট ব্রেনের উপর প্রেসার ফেলতে পারে ,এজন্য এই রোগ হতে পারে ।
  • গর্ভাবস্থায় ধূমপান, কোনো প্রকার মাদক সেবন বা অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট ওষুধ সেবন থেকেও শিশুর মধ্যে এডিএইচডি দেখা দিতে পারে ।
  • পারিবারিক কলহ ,শিশুমনকে উদাসীন করে তোলে,এমনকি গর্ভবতী মা-কে টর্চার করলেও শিশু ADHD প্রভাব নিয়ে জন্মাতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় মানসিক রোগের ওষুধ সেবন শিশুর ADHD হওয়ার পেছনে বহুলাংশে দায়ী।
  • (যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের ‘মলিকিউলার সাইকিয়াট্রি’ বিভাগের অধ্যাপক রয় পেরলিসের গবেষণা)

ADHD রোগীর বিশেষ কিছু লক্ষণ

শিশুর মধ্যে ADHD এর লক্ষণ প্রকাশ পায় ৪/৫ বছর বয়স থেকে এবং ৮/৯ বছর বয়সে তা তীব্র আকার ধারণকরে। ১৫/১৮ বছর বয়সে তা দূর্দমনিয় হয়ে পরে ।

  • অতিরিক্ত চঞ্চলতার সাথে অতিমাত্রায় অমনোযোগী থাকা ADHD শিশুর প্রধান লক্ষণ
  • যা দেখে তাই নেওয়ার জন্য বায়না ধরে। কিন্তু দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য কিছুতে আকৃষ্ট হয়ে সেটা চাইতে থাকে ।
  • মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না, বাড়ি বা স্কুল কোথাও মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে মন:সংযোগ করতে পারে না।
  • ধৈর্যহীন – খেলাধুলার ক্ষেত্রে সে তার পালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে  চায় না । এজন্য তার বন্ধুদের বিরক্ত করে এমনকি মারামারি পর্যন্ত চলে যায়।
  • উদাসী চলন- খরচ করার পর দোকানীকে টাকা দিয়ে অতিরিক্ত টাকা ফেরত না নিয়েই চলে আসে । এমনকি স্কুলে গেলে প্রতিদিন কিছু হারিয়ে আসে।
  • কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে ওঠে, চিৎকার করে ,হাতে তালি বাজায় এবং লাফালাফি করে।
  • প্রায়সম্পূর্ণ অগোছালো – কাজ গুছিয়ে করতে পারে না, গুছিয়ে রাখতে পারে না। এমনকি কথা ও প্রশ্নের উত্তরও গুছিয়ে বলতে বা লিখতে পারে না ।
  • অতিরিক্ত চঞ্চলতা প্রকাশ করে, একমূহূর্ত চুপ করে বসে না। অত্যাধিক ছোটাছুটি করে।
  • অনেক সময় বাচাল হয়ে পরে বা অত্যধিক কথা বলতে শুরু করে ।
  • লেখাপড়ায় অমনোযোগী নিজের পড়া তো করে না বরং সহপাঠি এবং শিক্ষককে পর্যন্ত বিরক্ত করে।
  • ইজি কাজে বিজি সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ঘরের জিনিসপত্র প্রয়োজন ছাড়াই খুটখাট করতে থাকে।
  • ধ্বংসাত্মক মানসিকতা হয়ে থাকে বিভিন্ন খেলার সামগ্রী, ছোটছোট যন্ত্রপাতি খুলে দেখতে চায়, গুরত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলে।

ADHD এর পরণতি

ADHD আক্রান্ত শিশুর  যদি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না হয়, তবে পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যাগুলো হলোADHD

  • আচরণগত সমস্যা (কনডাক্ট ডিসঅর্ডার)
  • মেজাজ-মর্জিগত সমস্যা (মুড ডিসঅর্ডার),
  • মানসিক উদ্বিগ্নতা(অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার)
  • শেখার অক্ষমতা। (লার্নিং ডিসঅ্যাবিলিটি)
  • চরত্রগত সমস্যা( ক্যারেক্টার ডিসঅর্ডার)
ADHD এর ভয়াবহ পরিণতিঃ

অমনোযোগীতামূলক মানসিক সমস্যার অন্যতম কারণ ১০-১২ বছর বয়সেই এরা নানবিধ যৌনবিকার (যেমন হস্থমৈথুন , পর্ণগ্রাফি আসক্তি) গ্রস্থ হয়ে পরে।

অনেকেই  পূর্নবয়স্ক হয়ে বিকৃত মানসিকতা  (কামুকতা ,স্বমেহন,  ধর্ষন , খুন ) , মাদকাসক্ত ও সমাজবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ে।

রোগটি চিন্থিত করে লক্ষণ বিবেচনায় উপযুক্ত হোমিওপ্যথিক চিকিৎসা দিলে শুরুতেই মূলুৎপাঠন করা যায় । ADHD শিশুর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাঔষধ খুবই কার্যকর হয়ে থাকে।

ADHD শিশুর  পরিচর্যা কিভাবে করবেন?

সাইকোথেরাপি বা মানসিক পরিচর্যাঃ
  • এই রোগে চিকিৎসা কমই প্রয়োজন হয় উপযুক্ত মানসিক পরিচর্যা ,সাইকোথেরাপি  শিশুর  স্বাভাবিক জিবনে ফিরে আসতে দারুন কার্যকর ।
  • এই কাজে  একজন অভিজ্ঞ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক হতে পারে শিশুর উপযুক্ত সাইকোথেরাপিস্ট ।
  • এছাড় স্কুল শিক্ষকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আপনার শিশুর এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হতে পারে ।
  • প্রতিবেশি , বন্ধু-স্বজন সহানুভূতিশীল হলে শিশুর আচরণ খুব দ্রুত সংশোধন হয়ে যায় ।
  • তাই শিক্ষক , চিকিৎসক , প্রতিবেশি , বন্ধু-স্বজন  সকলের সহায়তা নিন।তার সাথে ইতিবাচকতা প্রদর্শন করুন ।
নিম্নোক্ত ভাবে শিশুর পরিচর্যা করুনঃ
  • শিশুকে পর্যাপ্ত সময় দিন যাতে সে বাসায় এবং স্কুলে মনোযোগী হয়ে উঠতে পারে।
  • শিশুর প্রত্যেক ভাল কাজ বা ভালো আচরনর জন্য তাকে পুরস্কৃত করুন। কমপক্ষে একটা থ্যাংকস বলুন বা প্রশংশা করুন ।
  • কখনোই তিরস্কার করবেন না ব্যর্থতাকে সহজভাবে মানে নিতে শেখান।
  • শিশুকে একই সময়ে একাধিক কাজের আদেশ দিবেন না ।
  • যেমন, বলবেন না যে, বাংলা বই পড়া শেষ করে গণিত শুরু করবে । বরং বাংলা পড়া আদায় করে নিয়ে তার পড়া মূল্যায়ন শেষে প্রশংসা করে গণিত করতে  দিন।
  • রুটিন করে শিশুকে রুটিন মানার উপকারিতা ও তাকে এজন্য পুরস্কৃত করুন । তার পাশে থেকে প্রতিটি কাজ উৎসাহ দিয়ে আদায় করুন .
  • সকাল বিকাল ব্যায়াম ও খেলাধুলার ব্যবস্থা করুন । এতে শিশুর ভেতরের লুকানো শক্তি  বেরিয়ে আসতে সাহায্য পাবে ।
  • ভুল করলে শিশুকে শাস্তি দিবেন না- তার ভুলটাকে ভুল না বলে যে ক্ষতি হলো সেটা বোঝানোর চেস্টা করুন।

[যেমন একটা খেলনা ভেঙ্গে ফেললে তাকে না মেরে বুঝান দেখতো এটা দিয়ে আর খেলা যাচ্ছে না । আমাদেরই ক্ষতি হলো  ইত্যাদি । দেখবেন অল্প দিনেই সে একই ভুল করা ছেরে দিবে ।]

শিশুর ADHD জন্য হোমিওপ্যাথিক  চিকিত্সা সর্বোত্তম।

শুরুতেই অর্থাৎ ৪/৫ বছর বয়সেই যদি লক্ষণ অনুসারে শিশুর চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথিক ঔষধ দেয়া যায় তবে পরবর্তিতে  ADHD প্রকাশ পায় না ।ছোট বেলায় কান্না আর জিদের লক্ষণ দৃষ্টে ঔষধ দিলে ।  যেমন-সিনা , ক্যামোমিলা ,কফিয়া ক্রুডা , ভিরেট্রাম আল্ব,স্ট্রামোনিয়াম , হায়োসিয়াম ইত্যাদি দুই এক মাত্রাই যথেষ্ট হয়ে থাকে। এগুলোর লক্ষণ মেটেরিয়া মেডিকায় বিস্তারিত পাবেন । ঔষধের মাত্রা ও সেবন বিধি এজন্য দেয়া হয়নি যে রেজিস্টার্ড হোমিও চিকিৎসক মাত্রই অবগত । আর এই মেডিসিন গুল লক্ষণ মিললে দু এক ডজেই রোগ নিমূল হতে দেখা যায় ।

এভেনা স্যাট এবং ভায়োলা অডোরা এর কম্বিনেশন মেডিসিন সিন্যাপ্টল ADHD রোগের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে।তবে তা মেটেরিয়া মেডিকা সমর্থন করে না কিন্তু প্রকৃত মেডিসিন মেটেরিয়া মেডিকার দুইটি আলাদা মেডিসিনের মিশ্রন । এব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত চিকিৎসক নিবেন ।  এজন্য লক্ষণ সদৃশ্যে একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিন  এবং হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবন করতে দিন । আপনার শিশু সুস্থ হয়ে উঠবে ইনশা-আল্লাহ।

3 thoughts on “ADHD -অতিদুষ্ট ও অমনোযোগী শিশুর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *